০৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:৪৭, ৮ অক্টোবর ২০২৬

বিএনপিতে অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে

বিএনপিতে অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে

স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের সংঘাত, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ, দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের এক নেতার পদত্যাগ- সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এর পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব, ইউনিট কমিটি গঠন এবং নতুন কমিটি দেওয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে। বিশেষ করে দুই বছর ধরে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি না হওয়ায় সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মহানগর যুবদলেও নেতৃত্ব ও ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।

গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়নসহ কয়েকজন আহত হন বলে জানা যায়।

আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন নিয়ে বিরোধ থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। তবে ঘটনার জন্য দুই পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করেছে।

আদালতপাড়ার এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুই বিএনপি নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এ সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

একই দিন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধন। পদত্যাগপত্রে তিনি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া এবং সাংগঠনিক অস্থিরতার অভিযোগ তোলেন।

সামছুন নূর বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৫ সালের মার্চে কমিটি গঠনের পর সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উপদলীয় কর্মকাণ্ডের কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দুই বছরেও হয়নি ছাত্রদলের নতুন কমিটি

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে।

২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে জেলা ও মহানগরের অধীন উপজেলা, থানা, পৌরসভা, কলেজ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

এরপর দুই বছর পার হলেও জেলা ও মহানগরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে তাদের দাবি।

এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নাহিদ হাসান ভূঁইয়াকে সভাপতি ও জুবায়ের রহমান জিকুকে সাধারণ সম্পাদক করে নয় সদস্যের জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। একই দিন রাকিবুর রহমান সাগরকে সভাপতি ও রাহিদ ইসতিয়াক সিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে ছয় সদস্যের মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, নতুন কমিটি না থাকায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতারা সাংগঠনিক পদ ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সংগঠনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

যুবদলেও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ

ছাত্রদলের পাশাপাশি মহানগর যুবদলের অভ্যন্তরেও নেতৃত্ব ও ইউনিট কমিটি গঠন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘদিন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি না হওয়া এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির একাংশের।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সহিদুল ইসলাম পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। পরদিন ১ অক্টোবর চিটাগাংরোড এলাকায় অনুসারীদের নিয়ে পৃথক শোডাউন করেন তিনি। এর আগে মহানগর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর প্রধানও পৃথক কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসেন।

২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মনিরুল ইসলাম সজলকে আহ্বায়ক, সাগর প্রধানকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাহেদ আহমেদকে সদস্যসচিব করে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও ইউনিট পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদল নেতা অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মহানগর যুবদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটিকে সামনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে তাঁর অনুসারীদের অভিযোগ।

নির্বাচন সামনে, বাড়ছে চাপ

আদালতপাড়ার প্রকাশ্য সংঘাত, সাংগঠনিক শোকজ, আইনজীবী ফোরামের নেতার পদত্যাগ এবং অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ- সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও নেতৃত্বের সমন্বয় এখন আলোচনায়।

বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচন সামনে থাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকা সংগঠনগুলোতে পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং বিদ্যমান নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ নির্বাচনের সময় আরও দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

এ অবস্থায় স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কীভাবে এসব বিরোধ মেটায়, অঙ্গসংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠন এবং নেতৃত্বের সমন্বয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়- সেদিকেই নজর রয়েছে নেতাকর্মীদের।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়