ঢামেকে মারা যাওয়া কারাবন্দি সজীবকে মারধর করে পুলিশে দেওয়া হয়েছিল
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দি ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় গ্রেপ্তার এক তরুণ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত নয়টার দিকে মো. সজীব আহমেদ নামে ২৫ বছর বয়সী ওই তরুণের মৃত্যু হয় বলে জানান জেল সুপার আব্দুল কুদ্দুছ।
তিনি বলেন, “কারা হেফাজতে নেবার সময় তার শরীরে অ্যাসল্টের আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রথমদিন থেকেই তিনি কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। পরে চিকিৎসায় ওই বন্দি সুস্থও হন।”
গত শনিবার আবারও সজীব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়।সেখান থেকে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। গত পাঁচদিন সজীব ঢামেকে চিকিৎসাধীন ছিল বলে জানান জেল সুপার।
“ওই বন্দির অ্যাজমা ও উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা ছিল,” যোগ করেন আব্দুল কুদ্দুছ।
সজীব সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি মাইজপাড়া এলাকার সানাউল্লাহর ছেলে। তাকে গত ১২ জুলাই রাতে মিজমিজি এলাকার একটি বেকারি পণ্যের দোকানের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তার সময় পুলিশ জানিয়েছিল, ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে একটি রিভলভার, ছয় রাউন্ড গুলি, তিনটি ধারালো রামদা, একটি টর্চলাইট ও একটি পুরোনো কালো রঙের মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র উদ্ধার ও ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে মামলা করে পুলিশ।
তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যা ও অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকার একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, সজীবের পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের রাতে পুরোনো দ্বন্দ্বের জেরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি কাউন্সিলর ইকবাল হোসেনের অনুসারী কয়েকজন কর্মী তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে। ওই সময় মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মমিনুর রহমান বাবুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মারধরের পর সজীবকে পুলিশে দেওয়া হয়।
সজীবের বোনের স্বামী নিশাত বলেন, “গ্রেপ্তারের আগে সজীবকে মারধর করা হয়েছিল। কারা হেফাজতে তার মৃত্যু স্বাভাবিক অসুস্থতার কারণে হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। সে মারা গেছে, এখন আর কোনো অভিযোগ করতে চাই না। আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুই ধরে নিয়েছি।”
তবে, অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, “সজীব কিশোর গ্যাং এর সদস্য ছিল। সে দলবল নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের মমিনুর বাবুর উপর হামলা চালাতে গিয়েছিল। তখন স্থানীয়রা ধাওয়া দিয়ে ওরে আটক করে পুলিশে দেয়। তখন তাকে এলাকার লোকজন মারধর করেছিল কিনা তা আমি জানি না।”
সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির এ নেতা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক বাস চালককে মারধর ও এক গবেষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। তবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৩ নভেম্বর তাকে দলে ফিরিয়ে নেয় বিএনপি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বরও ফতুল্লার এক ব্যক্তির জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ ওঠে ইকবালের বিরুদ্ধে। ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারের সামনে ওই জমির মালিককে ইকবালের গালাগালি ও এক কিশোরকে থাপ্পর মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে, কারা হেফাজতে সজীবের মৃত্যুর বিষয়ে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মমিনুর রহমান বাবু বলেন, “এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সজীব ও তার দলবল মহড়া দিচ্ছিলো। তখন এলাকাবাসী তাদের ধাওয়া দিয়ে সজীবকে ধরে। সে অস্ত্র প্রদর্শন করলে লোকজনের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় কিন্তু মারধর করা হয়নি।”
মমিনুরের দাবি, তার বাড়ির পাশেই ঘটনাটি ঘটে। তিনি বাসায় ঢোকার সময় সজীবকে এলাকাবাসীর হাতে আটক দেখেন। পরে সেখানে যান।
এ বিষয়ে কথা বলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হকের সরকারি মুঠোফোনের নম্বরে কল করা হলে সেটি রিসিভ করেন পরিদর্শক (তদন্ত) মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, তাদের থানার মামলার একজন আসামি কারা হেফাজতে মারা গেছেন বলে জেনেছেন। তার মৃত্যুর বিষয়ে কোনো অভিযোগ পরিবারের সদস্যরা করলে সে অনুযায়ী তদন্ত করা হবে।





































