হাজী সেলিমের সহযোগী বাবুলের পুরোনো অধ্যায়, ছিলেন আ.লীগের কাউন্সিলর
নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাঙ্গলবন্দে প্রায় ১৫০ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের একজন মেসার্স বাবুল প্লাস্টিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম বাবুল।
লাঙ্গলবন্দের এই জমি বিরোধের সূত্র ধরে বাবুলের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অতীত খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন সময়ে তাকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম বাবুল পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন। ২০১৭ সালেও তিনি ডিএসসিসির ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে একই ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন তিনি।
পুরান ঢাকার স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, তৎকালীন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন বাবুল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুরান ঢাকার রাজনীতিতে হাজী সেলিমের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে দাবি স্থানীয় সূত্রগুলোর।
কাউন্সিলর থাকাকালে বাবুলকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে আসে। ২০১৭ সালে পশ্চিম ইসলামবাগের বাসিন্দা হাজি আব্দুল জলিল তৎকালীন কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম বাবুলের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ তুলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
এর তিন বছর পর ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগের রাতে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীর এক সমর্থককে মারধরের অভিযোগ ওঠে বাবুলের ভাগ্নে ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি তখন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, বাবুলের ভাগ্নে রুবেলের নেতৃত্বে কয়েকজন তার ওপর হামলা চালান।
কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও দলীয় কর্মসূচিতেও বাবুলের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ইসলামবাগে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
বক্তব্যে শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে আরও কয়েক বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বাবুল। পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলকে সরকারের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, এসব প্রকল্প একসময় মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল।
পদ্মা সেতুর অর্থায়ন প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছিলেন বাবুল।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় পুরান ঢাকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাবুলকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলেও দাবি তাদের। তবে তিনি কোথায় ছিলেন কিংবা কোনো মামলার কারণে আত্মগোপনে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এরপর মেসার্স বাবুল প্লাস্টিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সূত্র ধরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাঙ্গলবন্দে তার ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।
বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাকসুদ হোসেনের স্ত্রী নার্গিস আক্তার পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, লাঙ্গলবন্দ মৌজায় তার বাবা মৃত কাজী গিয়াসউদ্দিন ও ভাসুর মৃত আনোয়ার হোসেনের মালিকানাধীন প্রায় ১৫০ শতাংশ জমি দখলের চেষ্টা করছে মেসার্স বাবুল প্লাস্টিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, জমিটির দখল বজায় রাখতে তার ভাসুরের ছেলে আশরাফুল ইসলাম বাদী হয়ে বন্দর আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা করেছেন। আদালত বিরোধপূর্ণ ওই জমির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছেন বলে দাবি তার।
নার্গিস আক্তারের অভিযোগ, গত তিন মাস ধরে জাহাঙ্গীর আলম বাবুলের যোগসাজশে জমিটি দখলের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে তাদের বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি জমি ছেড়ে না দিলে তাদের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, আইনি ঝামেলা এড়াতে এবং বন্দর থানার ওসির অনুরোধে তারা স্বেচ্ছায় ওই জায়গা থেকে জিমের মালামাল সরিয়ে নেন। এরপরও বালুর গদি ও ব্যবসায়িক অফিস সরিয়ে নিতে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি নার্গিস আক্তারের।
গত ১ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে লাঙ্গলবন্দ বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন চিড়াইপাড়ায় তার ছেলে মাহমুদুল হাসান শুভর অফিস ও বালুর গদিতে শতাধিক ব্যক্তি হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার দাবি, হামলার সময় বালু বিক্রির ক্যাশে থাকা ১ লাখ ২ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। এসি, সিসি ক্যামেরা, আসবাবপত্র, ল্যাপটপ এবং দরজা-জানালার কাচ ভাঙচুর করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়। পরে বালুর কাজে ব্যবহৃত ভেকু বের করে দিয়ে অফিস ও বালুর গদির মূল প্রবেশপথে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
লিখিত অভিযোগে জাহাঙ্গীর আলম বাবুলের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, জমির দখল নিতে বাবুল স্থানীয়ভাবে তাদের সহযোগিতা নিচ্ছেন।
একসময় পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ডিএসসিসির কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতেও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ উঠেছিল। এবার সরকার পরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে আরেকটি জমি নিয়ে বিরোধে তার নাম সামনে এসেছে।
আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা ও জমি দখল চেষ্টার অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে জাহাঙ্গীর আলম বাবুলের মুঠোফোনের নম্বরে সংযোগ পাওয়া যায়নি।





































