শাহরিয়াজ শুভ্র হত্যা: যে বিচার ঝুলে আছে নয় বছর
বাবা শাহরিয়াজ শুভ্র,
আজ তোমার নিহত হবার নয় বছর। ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মাগরিবের পর সাদা চেক শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পরে তুমি আমার পাশ দিয়ে বাইরে যাচ্ছিলে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘তুই কই যাস?’ তুমি বলেছিলে, ‘এই তো আসছি।’ জীবিত তুমি বেরিয়ে গেলে। দুই দিন পর ফিরে এলে সাদা কাফনে ঢেকে।
তারপর একে একে কেটে গেল নয় নয়টি বছর। বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষ্যায় গড়িয়ে গেছে কত শত কিউসেক জল। তার হিসাব হয়তো পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আছে। কিন্তু সন্তানহারা পিতা-মাতার কত হাজার ফোঁটা চোখের জল নীরবে ঝরে চলেছে, তার হিসাব কেউ রাখে না।
কত বিনিদ্র রজনীতে বুকের পাঁজরে হাহাকার ওঠে। কত আধোঘুমে তোমার ছায়াস্বপ্ন দেখে ডুকরে ডুকরে কাঁদি।
বলতে পারো কেন কাঁদি?
আসলে আমরা কাঁদি না। কান্নার সাগর এখন শুকিয়ে গেছে। চোখে জল নেই। উষর মরুর ধূসর বুকে এখন আমাদের বিচরণ। বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে হেঁটে চলেছি। মরার মিছিলে কেঁদে কী কোনো লাভ আছে, বাবা!
এই নিষ্ঠুর সমাজ শুধু দেখে; অনুভব করে না। একেকটি ভিকটিম পরিবার যেন গিনিপিগ হয়ে বেঁচে আছে। তোমাকে হারিয়ে যে ব্যথা পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি আহত হয়েছি কাঁটার খোঁচায়।
না, আমি আইনের কথা বলব না। এ দেশে আইনই যেন ন্যায়বিচারের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ দেশে আইন মনে হয় অপরাধীদের সুরক্ষার কবজ। তোমার নিহত হওয়ার পর তা প্রতি পদে পদে উপলব্ধি করে চলেছি।
আসলে আইন তো বিমূর্ত। তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা মূর্ত হয়। মূর্তিমান আইন যখন দুষ্টের লালনক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন তা আর ন্যায়বিচারের হাতিয়ার থাকে না হয়ে ওঠে নিপীড়িতের জন্য আরেকটি যন্ত্রণার নাম।
তোমার মৃত্যুর পর আমরা শুধু একজন সন্তানকে হারাইনি, বাবা। হারিয়েছি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথটুকুও। একটি মামলা, একটি তারিখ, একটি আশ্বাস এই করতে করতে নয়টি বছর পার হয়ে গেল। ক্যালেন্ডারের পাতায় বছর বদলেছে, ঋতু বদলেছে, মানুষ বদলেছে; শুধু আমাদের অপেক্ষার দিনটি বদলায়নি।
তুমি নেই এই সত্যটি আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তোমার হত্যার বিচার হবে এই বিশ্বাসটুকু নিয়ে যে পথ চলেছিলাম, সেই পথই বারবার আমাদের ক্লান্ত করেছে।
কখনো মনে হয়েছে, তোমার রক্তের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে প্রভাব, অর্থ আর কৌশল। কখনো মনে হয়েছে, একজন নিহত মানুষের চেয়ে জীবিত অপরাধীর সুবিধা-অসুবিধার মূল্যই যেন বেশি।
কী বিচিত্র মানুষ, বাবা। একটা পরিবার প্রচণ্ড শোকে মুহ্যমান হয়ে আছে। চোখে ঘুম নেই, নাওয়া নেই খাওয়া নেই। কান্নারও ভাষা নেই। অথচ পত্রিকার ভাষা সেখানে শানিত! সমাজের ভাষা প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রের ভাষা সন্ধিহান! আর তোমার সহচরদের চোখের ভাষায় লুকোচুরি।
তোমার ডেডবডির সিন্ড্রোম নির্মম। ইনভেস্টিগেশন বড়ই রহস্যময়। যে প্রশ্ন আজও নারায়ণগঞ্জের সচেতন মানুষের মুখে মুখে ছিনতাইকারীরা কি এত নির্মমভাবে হত্যা করে?
তবে এটাও সত্য, ধৃত ছিনতাইকারীদের কাছেই তোমার মোবাইলসহ আনুষঙ্গিক জিনিস উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু কেউ কি ওদের দ্বারা তোমাকে হত্যা করিয়েছে? এদিকটায় ইনভেস্টিগেশন এগোয়নি কেন?
কেন একটা পত্রিকা প্রথমে তোমাকে সাংবাদিক হিসেবে নিউজ করেনি? কেন তোমার নামে স্মরণিকা বের করার জন্য লেখা সংগ্রহ করেও সেই স্মরণিকা আলোর মুখ দেখেনি? কে বা কারা তোমার স্মরণসভা আয়োজনের প্রতিবন্ধক হয়েছিল?
জানি, এ রহস্যের উত্তর হয়তো কখনো পাবো না। হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় অনেক প্রশ্নই প্রশ্ন হয়ে থেকে যাবে। কিছু দরজা আর কখনো খুলবে না, কিছু অন্ধকারের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকবে অনেক সত্য।
কিন্তু সকল প্রশ্ন ও রহস্যের ভেদ উন্মোচনকারী সত্তার আদালতে আর্জি পেশ করতে তো কোনো বাধা নেই।
সেই আদালতেই আজ তোমার হয়ে আমাদের এই নীরব ফরিয়াদ।
হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি জানো সেদিন কী ঘটেছিল। তুমি জানো কার হাতে শাহরিয়াজের মৃত্যু, তুমি জানো কার নির্দেশে, কার প্ররোচনায় কিংবা কার নীরব সহযোগিতায় কোনো অন্যায় ঘটে থাকলে তার সত্য কোথায় লুকিয়ে আছে।
মানুষের আদালতে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি, তোমার আদালতে যেন তার একটিও প্রশ্ন অনুত্তরিত না থাকে।
বাবা শাহরিয়াজ, নয় বছর পরও তুমি আমাদের কাছে কোনো পুরোনো স্মৃতি নও। তুমি আমাদের প্রতিদিনের শূন্যতা, প্রতিদিনের প্রশ্ন, প্রতিদিনের দীর্ঘশ্বাস।
তুমি নেই কিন্তু তোমার জন্য আমাদের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
শুধু অপেক্ষাটা এখন আর তোমার ফিরে আসার নয়;
সত্যের ফিরে আসার।
লেখক: কামাল সিদ্দিক, শাহরিয়াজ শুভ্রের পিতা





































