ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান
কোটা বাতিল নয়, কোটার সংস্কার করো, বৈষম্য দূর করো।
৫ জুন ২০২৪ থেকে শুরু হলো কোটা সংস্কার আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী তীব্র ও বড় ধরনের আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে।
ছড়িয়ে পড়লো—কোটা না মেধা, মেধা মেধা।
১৪ জুলাই ২০২৪; কোটা সংস্কারের দাবিকে ভুল পথে ঠেলে দিয়ে সাবেক স্বৈরাচার শাসক আপামর শিক্ষার্থী সমাজকে 'রাজাকারের নাতিপুতি' হিসেবে আখ্যায়িত করলেন! চারপাশ থেকে ধেয়ে আওয়াজ আসতে শুরু করলো—'তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার, কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!' 'চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার' স্লোগানে উত্তাল ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর। উত্তাল পুরো বাংলাদেশ। ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। সমালোচনার ঝড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিভি চ্যানেলের পর্দায়। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের।
১৫ জুলাই ২০২৪; সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' নষ্ট করার গুরুতর অভিযোগ দিয়ে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী বাহিনী লাঠি, রামদা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে আমার বোনের শরীরে, আঘাত করে আমার ভাইকে। রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয় লাখো শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে।
১৬ জুলাই; সারা বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ তীব্র থেকে তীব্রতর আন্দোলন গড়ে তুলে। যৌক্তিক আন্দোলনে আবারও চলে লীগসন্ত্রাস এবং পুলিশি হামলা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার ভাই আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে যেন বলছে—
এই স্বৈরাচারের দল, 'বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।'
এক স্বৈরশাসককে আগলে রাখতে নিষ্ঠুর পুলিশ করলও তাই। টগবগে আবু সাঈদ নিমিষেই লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। দাঁড়াতে চেয়েও আর দাঁড়াতে পারলো না আবু সাঈদ। তাঁর নিথর দেহ সংবাদ দিলো—বীরশ্রেষ্ঠ আবু সাঈদ, তোমার রক্তের দামে লেখা হবে এক নতুন বাংলাদেশের নাম।
আবু সাঈদের মায়ের, বোনের, স্বজনের আহাজারি বাতাসে করে ভেসে বেড়ালো প্রতিটি হৃদয়ে হৃদয়ে।
১৭ জুলাই; আবু সাঈদ, ফারুক, ফয়সাল, শাহজাহান, ওয়াশিমের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশে। সেই কর্মসূচিতেও রাজু ভাস্কর্যে আবারও তীব্র হামলার শিকার শিক্ষার্থীরা। বন্ধ হয় মোবাইল নেটওয়ার্ক।
১৮ জুলাই; ভাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যতদিন যায়, আন্দোলন তীব্র হয়। সারা বাংলাদেশের আনাচেকানাচে আন্দোলিত হয় ছাত্রসমাজ। নারায়ণগঞ্জেও সেদিন আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট, গুলিতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়ে ভর্তি হয় ভিক্টোরিয়া, খানপুর ও অন্যান্য হাসপাতালে। সেদিনের এই সন্ত্রাসী হামলায় আজীবনের জন্য দুই চোখের দৃষ্টি হারায় তোলারাম কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী আমাদের মাহবুব। সেদিনই বন্ধ করা হয় ইন্টারনেটের পুরোপুরি সংযোগ। তারপর শুরু নির্মম হত্যাযজ্ঞ।
১৯ জুলাই; আহত, নিহতের সংখ্যা একদিনে বেড়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এভাবেই চলতে থাকে পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ! জারি হয় কারফিউ।
এমনিভাবেই চলতে থাকে গণগ্রেফতার, গণহত্যার মতো শাসনরাজ। জারি হয় অনির্দিষ্টকালের নাটকীয় কারফিউ।
রুখে দিতে চেয়েও পারেনি ছাত্রসমাজের মিছিল। মুক্তির পথে বাধা হানতে পারেনি তরুণ ছাত্রসমাজকে। একেকটা শিক্ষার্থী মিছিল, মিটিং, কবিতায় হয়ে ওঠে বিদ্রোহী কবি নজরুলের বিপ্লবের মতো।
বলতে শুরু করে—
স্বদেশকে নিয়েছি তো নিজ নীতির দলে
চলো আজ বেরিয়ে যাই মুক্তির মিছিলে।
দেখো না…
চারদিকে বারুদের গন্ধ,
ধোঁয়া, আগুন এবং ধোঁয়া।
অন্ধকার আমার চারপাশ।
হৃদয়টা যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে উঠছে।
মনে মনে অনুভব করছি,
একটি রাইফেল তুলে দিয়ে কেউ বলুক—
যাও কবি, যুদ্ধে যাও।
তোমার লেখার এই ভাষা এসেছিল যে যুদ্ধে,
তোমার চলার এই মাটি এসেছিল যে যুদ্ধে,
কিন্তু লেখায় ভাষা প্রকাশের যে ন্যূনতম দ্বিধা,
তা মুছে দিতে যাও, যুদ্ধে যাও।
আমি চাই তুমি যুদ্ধ করে ফিরিয়ে আনো
তোমার পূর্ণ স্বাধীনতা।
মুক্ত করো পরাধীনতার ভার!
মুছে দাও হৃদয়ের হাহাকার।
ফিরিয়ে আনো ব্যাটা অধিকার, পূর্ণ অধিকার।
যাও ছাত্র যাও। যাও কবি যাও, যুদ্ধে যাও।
আগুন লাগাও, হোক দাউদাউ।
কেউ একবার বিপ্লবী কণ্ঠে ডাক দাও—
যুদ্ধে যাবার ডাক, হাক তুলে হাক।
এই যুদ্ধেই তবু হৃদয় মুক্তি পাক।
হৃদয়টা যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে উঠছে।
অতঃপর ২৯ জুলাই; শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল তাক লাগিয়ে দেয় স্বৈরাচার সরকারকে। হারাম গদিতে নড়েচড়ে বসে পৈশাচিক হাসিনা।
৩০ জুলাই; সরকারি শোক প্রত্যাখ্যান করে মিছিল হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রক্তের রঙে রঙিন হয়।
৩১ জুলাই; গণগ্রেফতার, হামলা, মামলা, গুমের প্রতিবাদে 'মার্চ ফর জাস্টিস' ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
পহেলা আগস্ট ২০২৪; ৯ দফা দাবিতে পালিত হয় 'রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ'।
২ আগস্ট; তিন দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদী সমাবেশে ঢাকার রাজপথ উত্তাল।
৩ আগস্ট; ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল ঢুকতে থাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সারা বাংলা আজ এক সুরে জেগেছে। একসাথে বলছে—দফা এক, দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ।
৪ আগস্ট; এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক শহরে নগরে স্ফুলিঙ্গের মতো সারা বাংলাদেশের আনাচেকানাচে ক্ষোভে ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ জনতা জাগ্রত হয় নতুন উদ্যমে। বলতে শোনা যায়—
'আমার দেশ, তোমার দেশ
বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।'
আপস না সংগ্রাম,
সংগ্রাম সংগ্রাম।
৫ আগস্ট; ঐতিহাসিক লংমার্চ—'লংমার্চ টু ঢাকা'র ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একদিন এগিয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়—
'ঢাকায় এসো জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা' স্লোগানে স্লোগানে—নীরবে নিভৃতে ৪ আগস্ট রাত থেকে সারাদেশ থেকে ঢাকা অভিমুখে ছুটতে শুরু করে মানুষের ঢল। কিসের সান্ধ্য আইন, কিসের কারফিউ! প্রত্যাখ্যান করে কারফিউ! না ঢাকা, না চট্টগ্রাম, না রংপুর, না খুলনা! টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া—ছাত্র-জনতা পায়ে হেঁটে ঢাকার রাজপথে ছুটতে শুরু করে। লক্ষ্য গণভবন, লক্ষ্য খুনি সরকারের পতন। ঢাকার মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড উপেক্ষা করে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে রাজপথ শাহবাগে। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা, চট্টগ্রাম—সারা বাংলাদেশে সেদিন চালানো হয় পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড! অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেকের পঙ্গুত্বে—অনেক ভাই-বোনের আত্মত্যাগ, কোমলমতি শিশুর আত্মত্যাগে সৃষ্টি হয় এক নতুন সূর্যোদয়ের। এক নতুন সূর্য উত্তোলনের যে অঙ্গীকার করেছিল ছাত্রসমাজ! সেই বিজয় আসে ৫ আগস্ট গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে।
রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস। চোখ থেকে বেয়ে পড়ে সুখের অশ্রু। শাহবাগে গাইতে শোনা যায়, 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে—রক্ত লাল, রক্ত লাল। রক্ত লাল…'
লেখক: নিরব রায়হান (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবেক আহ্বায়ক)





































