‘মাস্তুল’ রাত পোহাবার কত দেরি ?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
পাঞ্জেরী কবিতায় জাহাজের রূপকে সমাজের চিত্ররে তুইলা ধইরা কবি বারবার জিগাইছেন, রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী? এইখানে রাত মানে দুর্দিন, পাঞ্জেরীরে জিগানো হইতাছে সুদিন কবে আসবো! সুদিন কবে আসবো!
‘মাস্তুল’ ফিল্মটাতেও জাহাজ আছে, দুর্দিন আছে সুদিনের চাওয়া আছে। কিন্তু পাঞ্জেরী নাই, ফিল্মমেকার সম্ভবত দর্শকরে পাঞ্জেরী হইয়া উঠার প্রনোদনা দিতে চায়। প্রতিকী ভাবে 'পাঞ্জেরী' মানে যিনি বিপদ-আপদের সময় জনগণরে সহি পথ দেখায়, এই বিবেচনায় খোদ আমগ সমাজেই শুদ্ধ পাঞ্জেরীর বড়ই অভাব!
মনে পড়ে, ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে আমাদের বাড়িতে পুকুর ছিল, বাড়ি থেকা বের হয়া রাস্তার পাশেই পঞ্চাশ গজ দূরত্বের মধ্যেই আছিল আরো দুইটা পুকুর। জীবন বিমুখ অপরিকল্পিত আধুনিকায়নের ফাপরে পইরা সেইসব পুকুর এখন আর নাই শহরের বাড়ি আর এলাকা গুলাতে।
আমরা সেই সব পুকুরে প্রায়ই পাঁচ পাই, দশ পাই, চার আনা ইত্যাদি পয়সা ফালাইতাম, পরিবার থেকা আমাদের বলা হইছিল পুকুরে, নদীতে পয়সা ফালাইলে আপদ-বিপদ বালামসিবত দূর হয়, মঙ্গল আর পুন্য হয়। মাস্তুল ছবিতে ভালো মানুষের প্রতিনিধি বাবুর্চি চরিত্র মকবুল'রে দেখলাম, তারে শত্রু মনে করে যে সুকানি চরিত্রটি তার প্রতিও মঙ্গল কামনা কইরা নদীতে পয়সা ফালাইতে। মনে পড়লো ছোট বেলার সেই স্মৃতি।
জেমিনাইরে জিগাইলাম নদীতে/পুকুরে পয়সা ফালানোর বিষয়টা জানা আছেনি। ইন্টারেস্টিং তথ্য দিল জেমিনাই -
"বড়রা বলতেন এটা করলে "ভাগ্য ভালো হয়" বা "পুণ্য হয়"। তবে এই রীতির পেছনে কেবল অন্ধবিশ্বাস ছিল না, এর পেছনে ছিল প্রাচীন আমলের এক দারুণ বিজ্ঞানসম্মত এবং সামাজিক কারণ।
বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি:
১. তামার পয়সা এবং পানি বিশুদ্ধকরণ
এক সময় আমাদের দেশে যে পয়সাগুলো চলত, সেগুলো মূলত তৈরি হতো তামা (Copper)দিয়ে। বিজ্ঞানের নিয়মে, তামা পানির ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূর করতে এবং পানিকে বিশুদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। নদীতে বা পুকুরে (যা তৎকালীন সময়ে মানুষের প্রধান পানির উৎস ছিল)তামার পয়সা ফেললে, সেই তামা ধীরে ধীরে পানিতে দ্রবীভূত হতো। এর ফলে পানির মান ভালো থাকত এবং সেই পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতো।
২. পানি সংরক্ষণের এক সামাজিক কৌশল
প্রাচীনকালে সাধারণ মানুষকে যদি বলা হতো "পানির মান ভালো রাখার জন্য সবাই নদীতে তামা ফেলুন", তবে হয়তো অনেকেই অবহেলা করতেন বা গুরুত্ব দিতেন না। তাই সমাজ সংস্কারকরা একে ধর্মীয় রীতি বা ভাগ্যের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত হয়ে যায় যে, নদীতে পয়সা ফেললে পুণ্য হয় বা ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া যায়। ফলে মানুষ স্বেচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে নদীতে পয়সা ফেলত।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: এখনকার দিনে আমরা যে কয়েন বা পয়সা ব্যবহার করি, সেগুলো আর তামা দিয়ে তৈরি হয় না; বরং স্টেইনলেস স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম বা নিকেল দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো পানিতে ফেললে পানির কোনো উপকার তো হয়ই না, উল্টো পানি দূষিত হতে পারে। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এখন আর এই রীতির কোনো কার্যকারিতা নেই। ছোটবেলার এই স্মৃতিগুলো সত্যিই দারুণ! তখনকার অনেক রীতির পেছনেই এমন সুন্দর সব চিন্তাভাবনা লুকিয়ে ছিল।"
আচ্ছা এইবার,
নষ্টালজিয়া থেকা বের হয়া সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকা মাস্তুলের কিছুটা ময়নাতদন্ত করি চলেন – তবে বলে নেয়া ভালো যে, শিল্পীর শিল্পকর্মরে আমরা আক্ষরিক ভাবেও নিতে পারি আবার বিভিন্ন রূপকের সাথে তুলনার মাধ্যমে ডিকোড কইরাও নিতে পারি, এইটা যিনি শিল্পকর্মটি দেখতাছেন তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে ঘইটা থাকে। এইটা দর্শকের স্বাধীনতাও।
ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ সিনেমার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির অন্যতম ব্যক্তি, সমালোচক আন্দ্রে বাজাঁর মতে, ফটোগ্রাফি বা সিনেমা আসলে চলমান সময়রে বন্দি করার একটা যান্ত্রিক উপায়। তিনি বলতেন, সিনেমা অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে বাস্তবরে সবচেয়ে বেশি নিখুঁতভাবে তুইলা ধরতে পারে। সময়রে মমি কইরা রাখাসহ সময়রে তার স্বাভাবিক ক্ষয় থেকাও রক্ষা করে এই শিল্প মাধ্যমটি, এই কথা তিনি তাঁর বিখ্যাত "The Ontology of the Photographic Image" প্রবন্ধে কইছিলেন। নিশ্চয়ই বাস্তবতার উপস্থাপনে হুবুহু অনুকরণের পথে শিল্পী হাঁটেননা, ঐটা কারিগরের কাজ। আর বাস্তবতাওতো বহুমাত্রিক ও বৈচিত্রপূর্ণ। মাস্তুলে সমাজ বাস্তবতার উপস্থাপনে নির্মাতা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বিষয়বস্তু হিসাবে বাইছা নিছেন জ্বালানী তেলবাহী জাহাজে কর্মরত মানুষ ও নদীবন্দর এলাকার জনজীবনরে।
তো তেল সরবরাহের যে জাহাজটারে কেন্দ্র কইরা ছবির চরিত্র গুলা জিন্দা হইতাছিল সেই জাহাজটার নাম 'ও টি ইনসাফ - ১'।
হ, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর এই ‘ইনসাফ’ শব্দটা আরো অনেক বেশি শোনা যাইতাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। প্রায় সব পলিটিশিয়ানরা দেশে ইনসাফ কায়েম করার কথা কইয়া মুখে ফেনা তুইলা ফেলতাছেন। আর বাস্তবিকতাতো দেখতাছিই আমরা করুন চোখে, হায়রে!
ইনসাফ নামের জাহাজটাতেও অন্যতম চরিত্র সুকানি সাহেব ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা কইয়া জাহাজের তেল চুরি করা থেকা শুরু কইরা অন্যান্য কর্মিগ লগে অন্যায় আচরন করার আইকন হয়া উঠতে দেখি মানে জাহাজের সরকার প্রধান হয়া উঠতে দেখি। তেল চুরির টেকা পকেটে লইয়া তারে ফজর নামাজ পড়তে দেখি আমরা। মানে সে লোকদেখানো নামাজিও। কারন প্রকৃত নামাজি কখনো চুরি করতে পারেনা বইলাই আমরা মনে করি। অতঃপর ইনসাফের বদলে বে-ইনসাফই বেশি হইতে দেখি আমরা জাহাজটাতে। তো সেই হিসাবে কল্পনা শক্তির বদৌলতে এই ছবির জাহাজটারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ভার্সন কইয়া কিছুটা আরাম পাইতে পারি, নাকি?
নিশ্চয়ই বিষয় বস্তুর কারনেই ছবিটাতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো নারী চরিত্র নাই। তবে 'অবলা' নারী চরিত্রের পুরুষ প্রতিনিধি আছে। বেশি সুবিধা ভোগ করা পুরুষ মানে পুরুষ কেন্দ্রিক সমাজে নারীরে বলহীন আর বাকহীন দেখানো বা কইরা রাখার যে প্র্যাকটিস আছে এখনো, তা বলাই বাহুল্য। এইটাতো আমাদের প্রায় সবার অভিজ্ঞতাতেই আছে যে, আমাদের মায়েদের প্রায় কখনোই আব্বাদের সঠিক কিংবা ভুল কোনো সিদ্ধান্তের বিপরীতে যাইতে দেখি নাই, রাগ উঠলে আব্বারা গাইল দিতো মায়েদের, মায়েদের কখনো গাইল দিতে দেখি নাই, তেমন প্রতিবাদও করতে দেখি নাই কোনো বিষয়ে, মায়েদের কানতে দেখছি, নিজ পরিবাররে বেশুমার ভালোবাসতে আর আল্লার কাছে দোয়া করতে দেখছি মায়েদের। ছবির বাবুর্চি চরিত্র মকবুলের এই সবগুলা আচরণ আছে, হেই শরীরে পুরুষ হইলেও মনে আবহমান বাংলার মা বা কোমল 'অবলা' নারী। সুকানি চরিত্র দ্বারা নানা হয়রানির স্বীকার হইলেও তারে কোনো প্রতিবাদ করতে দেখিনা পুরা ছবিতে। মেটাফরিকেলি কইতে পারি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বেশি সংখ্যক জনগন মানে আমরা প্রায় সবাই আসলে মকবুলই মানে 'অবলা নারী'ই হা হা। হয়তো অতিরঞ্জিত হয়া যাইতাছে তাও বলি, জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নীরবতা বা প্রতিবাদহীনতার যে সংস্কৃতি, মকবুল যেন তারই প্রতিনিধি। তবে জাহাজে তাঁর আশ্রয় দেয়া ছিন্নমূল শিশু নুরার মধ্যে কিন্তু প্রতিবাদের ঝিলিক দেখি আমরা। আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ এই ছিন্নমূল শিশুরা । এদেরকে প্রাধান্য দিয়া তেমন একটা ফিল্ম হয়নাই মনেহয় এইখানে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের অপর শ্রেণীর অনাদর আর অবহেলায় বাইরা উঠে এইসব শিশুরা। বাজারে কুলিগিরি করা শিশু নুরার প্রতি মধ্যবিত্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের তাচ্ছিল্ল্যপূর্ণ আচরন দিয়া শুরু হয় ফিল্মে নুরার এন্ট্রি। আর এক্সিট হয় চড়-থাপ্পর, গালি খাইয়া চোর অপবাদ নিয়া। মাস্তুলে সমাজের এই বাস্তবতার উপস্থাপন ঠিকাছে। নুরার প্রাণবন্ত অভিনয় নজর কারছে।
ছবিটাতে লিনিয়ার প্রসেসে কংক্রিট কাহিনী বলার চেষ্টা কম থাকায় শুরুর কিছু সময় খাপছাড়া মনে হইতে পারে তবে আস্তে আস্তে লেয়ার উন্মোচন হইয়া চরিত্র গুলার ডাইমেনশনে ঢুকতে থাকলে ফিল্ম থেকা খেই হারানোর সম্ভাবনা নাই।
ছোট চরিত্র গুলারেও স্বাভাবিক আর বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলার জন্য চেষ্টা আছে মেকারের। সংলাপের ক্ষেত্রে জোর কইরা চাপায়া দেয়ার ঘটনা প্রায় ঘটে নাই, স্বাভাবিক আর অর্থপূর্ণ ছিল।
ধীর লয়ের গতিতে আগাইতে থাকা ফিল্মটাতে গুরুগম্ভির কোনো কেতাবি দর্শন নাই। প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ, বেদনা, লোভ-লালসা নিয়া রচিত সহজ সরল চিত্রনাট্য। প্রায় সব গুলা চরিত্র সরল স্বাভাবিক ভাবে একটিং করার কারনে মনে হইছে জীবনরেই দেখতাছি ফিল্ম দেখতাছি মনে হয় নাই, সিরিয়াসলি। তবে বাবুর্চি মকবুল চরিত্রের অভিনয় কিছুটা নাটকীয় মনে হইছে, তাঁর কাজ আরো ভালো হইতে পারতো।
জাহাজের মালিক চরিত্রটার আচার-আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক লাগছে। যদি সে জাইনাই থাকে যে তেল চোর কে, তাইলে তারে ডিরেক্ট ধরতাছেনা কেনো, কেমন যেনো বেখাপ্পা লাগছে! তবে রূপক বা মেটাফরের দিক থেকা চিন্তা করলে কিন্তু এইটারও একটা পলিটিক্যাল মিনিং দাঁড় করানো যায়। আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজেও তো "বড় মালিকেরা" বা নীতিনির্ধারকেরা জানে চোর কে, তাও নিজেদের স্বার্থে বা সিস্টেম টিকায়া রাখতে চোরদের ডিরেক্ট ধরে না, বরং দেখেও না দেখার ভান করে । রাজনৈতিক ডিকোড বেশি হয়া যাইতাছে মনে হয়, হা হা।
ফিল্মের শুরুর দৃশ্যটা মনে রাখার মতো, খুব মজার হইছে, আচ্ছা বরং স্পয়লার না দেই। তবে শুরুতে যেমন ইন্টারেস্টিং ওয়েতে উড়োজাহাজ দেখানো হইছে ফিল্মের মাঝখানেও মনে হয় দুই/একবার উড়োজাহাজ উড়ার শব্দ ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হইছে। এটাকি গল্পে পরিস্থিতির কঠোরতারে যন্ত্রবাহিত শব্দ দিয়া কিছুটা ট্রিগার করা হইছে? হইতে পারে! আবার এইও হইতে পারে যে যন্ত্র শিল্পের বিকাশের ভিতর দিয়া পৃথিবী কই আগায়া গেছে আর আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে মরতাছি, মারতাছি এই অনুভুতি প্রকাশ করছে।
কিম কি-দুকের ২০১৮ সালের ‘হিউম্যান, স্প্যাস, টাইম এন্ড হিউম্যান’ ফিল্মেও মকবুলের মতো সাইলেন্ট একটা রহস্যময় বৃদ্ধ ক্যারেকটার আছে, ঐ ফিল্মটাও একটা জাহাজের মধ্যে ঘটনা। ঐ ক্যারেকটারটাও জাহাজে ঘটা অপরাধ/অরাজকতা দেখে, কষ্ট পায় তবে প্রতিবাদ করেনা। মকবুলও কষ্ট পায় প্রতিবাদ করেনা। যদিও ঐটা কিছুটা সুপার ন্যাচারাল ভাইবঅলা ফিল্ম আর মাস্তুল পুরাই ন্যাচারাল মানে বাস্তব জীবনের ভালো মানুষি, কপটতা, চুরি, বদমাইশি, আদর ভালোবাসার ফিল্ম।
যান্ত্রিক আধুনিক সময়ের ভোগবাদী জীবন ব্যবস্থা যে ব্যক্তিরে সামষ্টিক মঙ্গলের কথা
ভাবতে দেয়না, ইন্ডিভিজ্যুয়াল আরাম-আয়েশরেই প্রাধান্য দিতে শিখায় তার চমৎকার রূপায়ন হইছে সুকানি চরিত্রের মাধ্যমে। লোভ, ঈর্ষা, কপটতার মোড়কে আবৃত এই চরিত্রটার মাধ্যমে নির্মাতা আসলে আমাদের সময়ের মূল ক্রাইসিসরে পোট্রে করছে বইলা মনে হইছে। দুঃখজনক হইলেও এইটা আমাদের জাতীয় চরিত্র।
জাহাজের সবাই জানে তেল চোর কে, কিন্তু বলেনা কেউ, একদিন ছিন্নমূল সরল মনের শিশু চরিত্র নুরা সত্য কথা কইয়া ওঠে, সেই শিশুর মতো রাজাযে লেংটা বইলা উঠছিল। নুরারে সত্য বলার খেসারতও দিতে হয় আশ্রয়হীন হওয়ার মাধ্যমে, তারে উলটা চোরের খেতাব দিয়া বিতারিত করা হয় জাহাজ থেকা। এই বাস্তবতাতো আমগ রাজনৈতিক সমাজেরও।
লাইটিং আর কালার প্যালেটে সত্যজিৎ রায় ফ্লেভার আনার চেষ্টা আছে মনে হইছে, তবে খারাপ লাগে নাই। ক্যামেরায় বুজরুকি দেখানোর চেষ্টা ছিলনা এই কারনে দৃশ্য গুলারে আপন মনে হইছে। বড় স্পেসরে প্রাধান্য দিয়া যে শট গুলা নেয়া হইছে তা আরাম তৈরি করছে চোখে।
সাউন্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে মিনিমালিজমের পরিচয় দিছেন ডিরেকটর। যতদূর মনে করতে পারি আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার নাই, শুধু ডাইজেটিক সাউন্ড হিসেবে আসছে বাবুর্চি মকবুলের বাঁশি বাজানো। বিশেষ কইরা এনভারমেন্টাল সাউন্ডের চমৎকার ব্যবহার ফিল্মটারে বাস্তবিক বানাইছে। বাজারে লোকজনের সোরগোলের মধ্যেও শুনতে পাই রেডিওতে বাজতে থাকা গান- চাতুরী করিয়া মোরে বান্ধিয়া পিরিতের ডোরে বিচ্ছেদের সাগরে ভাসাই গেলি রে বন্ধুয়া, আমার সাদা দিলে কাদা লাগাই গেলি,
তবে মনে হইছে আমাদের এখানের এখনকার বেশিরভাগ দর্শক এতো বেশি সাদামাটা চাকচিক্যহীন ফিল্ম দেখতে অভ্যস্ত না। ফিল্মিক বিনোদনের দিক থেকা বিবেচনা করলে ফিল্মটার বাণিজ্য করার সম্ভাবনা প্রায় নাই।
শেষ দৃশ্যে সাউন্ড হিসাবে নীরবতারে দারুন ভাবে ব্যবহার করা হইছে। আহারে! ছিন্নমূল নিরপরাধ শিশু চরিত্র নুরা, চুরির অপবাদ কাধে নিয়া বসে আছে জেটিতে, সামনে অসীম শূন্যতা। নিরবতা আর শূণ্যতার ঘোর কাটার আগেই দর্শকের কানে আসে পানিতে টুপ কইরা পয়সা পড়ার শব্দ, একটা দুইটা তিনটা অনবরত টুপটাপ পয়সা পড়তে থাকে পানিতে, আর অপরাধিরা বহাল তবিয়তে রয়া যাইতাছে সেই অনন্তকাল থেকাই, ছোট গল্পের মতো শেষ হইয়াও শেষ হইলোনা এরকম একটা ফিলিং রয়া যায় বইলা মনে হইলো, , ,
কবি ফররুখ আহমেদের পাঞ্জেরী কবিতার আরো দুই লাইন উদ্বৃতি দিয়া শেষ করি,
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি!
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!
লেখক: দিনার মাহমুদ (শিল্পী ও চিন্তক)





































