০১ জুলাই ২০২৬

জাহিদুল হক দীপু

প্রকাশিত: ১৯:১১, ১ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১৯:১৮, ১ জুলাই ২০২৬

নজরুলের নারায়ণগঞ্জে আগমন ও ‘অভিযান’ কবিতার শতবর্ষ পূর্তি

নজরুলের নারায়ণগঞ্জে আগমন ও ‘অভিযান’ কবিতার শতবর্ষ পূর্তি

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নারায়ণগঞ্জে আগমন এবং তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘অভিযান’ রচনার শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। ১৯২৬ সালের ২ জুলাই কবি নারায়ণগঞ্জে এসে তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাব (বর্তমান নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেড)-এ বসে ‘অভিযান’ কবিতাটি রচনা করেন। কবিতার শেষে তিনি নিজের স্বাক্ষরের সঙ্গে ২ জুলাই, ১৯২৬ তারিখও উল্লেখ করেন। সেই হিসেবে আজ কবির নারায়ণগঞ্জ আগমন ও ‘অভিযান’ কবিতার শতবর্ষ পূর্তি।

কবিতার শুরুতেই তিনি নতুন যুগের অভিযাত্রার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন—

“নতুন পথের যাত্রী, পথিক,
চালাও অভিযান!
উচ্চ কণ্ঠে উচ্চার আজ—
মানুষ মহীয়ান।”

এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই কবি মানুষের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর কাছে মানুষই সর্বোচ্চ শক্তি ও সভ্যতার মূল ভিত্তি। সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মে সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা তুলে ধরেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’-তে তিনি লিখেছেন—

“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান।”

জীবনদর্শনের প্রতিটি স্তরে তিনি মানুষকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। ধর্ম, বর্ণ ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষের দুর্দশা দেখে কবি ব্যথিত হন। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’। সেখানে তিনি বলেন—

“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মায়ের।”

জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন আপসহীন। ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ রচনায় সমাজের কুসংস্কার ও বিভাজনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অত্যাচার, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন এক দুর্বার কণ্ঠস্বর। তাঁর অমর কবিতা ‘বিদ্রোহী’-তে তিনি লিখেছেন—

“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল
আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ-কৃপাণ
ভীম রণভূমে রণিবে না।”

১৯২২ সালে তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানান। এ কারণে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে বহুবার কারাবরণ করেন। তাঁর পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়, বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। কারাগারে অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি অনশনও করেন এবং রচনা করেন অমর গান ‘কারার ঐ লৌহকপাট’।

নারী মুক্তির অগ্রদূত নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও নজরুল ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি লিখেছেন—

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’ ও ‘বাঁধনহারা’-য় নারী চরিত্রের আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম ও স্বাধীন চিন্তার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে। শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর কুলি-মজুর, কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামও নজরুলের লেখায় বারবার উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন—

“তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা?
ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লেখা।”

নিজের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতাই তাঁকে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর করে তুলেছিল। তাই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—

“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করিয়াছ মহান।”

প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুল ছিলেন প্রেম ও সৌন্দর্যের কবিও। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—

“আমার এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,
আর এক হাতে রণতূর্য।”

‘সিন্ধু’, ‘কুহেলিকা’, ‘বাঁধনহারা’সহ অসংখ্য রচনা প্রেম, প্রকৃতি ও মানবিক আবেগে সমৃদ্ধ। ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক নজরুল কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ইসলামী সংগীত, হামদ, নাত যেমন রচনা করেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তনও লিখেছেন।

তাঁর অমর ইসলামী সংগীত—

“রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।”

আবার শ্যামাসংগীতে লিখেছেন—

“কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।”

আর ভক্তিগীতিতে উচ্চারণ করেছেন—

“হে গোবিন্দ, রাখো চরণে।”

এভাবেই নজরুল হয়ে উঠেছেন সর্বজনীন মানবতা, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিকতার কবি। নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে নজরুলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক।

নারায়ণগঞ্জের মাটি ধন্য হয়েছে কবির নারায়ণগঞ্জের আগমনে। অনেক বার তিনি এসেছেন এ জনপদে। তবে ১৯২৬ এ তার আগমনে ভিন্নতা রয়েছে। নজরুলের আসার কয়েক মাস আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আসেন নারায়ণগঞ্জে। তাছাড়া নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘অভিযান’ তখনকার লিখা।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা।

জাহিদুল হক দীপু (সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠক)

সর্বশেষ

জনপ্রিয়