১৭ জুন ২০২৬

আসমাউল হুসনা

প্রকাশিত: ২০:৫০, ১৭ জুন ২০২৬

মন্ত্রী আসেন, তৎপরতা বাড়ে, তারপর?

মন্ত্রী আসেন, তৎপরতা বাড়ে, তারপর?

১৪ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এলেন, দেখলেন, নির্দেশ দিলেন। দুই দিন পর জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহাম্মদ মুশিউর রহমান পরিদর্শনে গেলেন। পর্যবেক্ষণ করলেন, নির্দেশনা দিলেন, আশ্বাসও শোনা গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরপর কী?

নারায়ণগঞ্জের মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর আগেও বহুবার দেখেছেন। কোনো মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ তৎপরতা বেড়ে যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসে। কিন্তু সফর শেষ হলে সেই তৎপরতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও ফিরে আসে।

নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এখানে চিকিৎসার আশায় আসেন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়, অনেক ক্ষেত্রে শেষ আশ্রয়স্থল। অথচ বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালটিকে ঘিরে অপরিচ্ছন্নতা, পানির সংকট, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের অনুপস্থিতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সেবার মান নিয়ে নানা অভিযোগ উঠে আসছে।

১৪ জুন দেশের বিভিন্ন জেলায় আইসিইউ সেবা সম্প্রসারণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন করেন। এটি নিঃসন্দেহে জেলার মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় জটিল রোগীদের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

তবে নতুন এই সেবার উদ্বোধনের পাশাপাশি মন্ত্রীর নজরে আসে হাসপাতালের দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা। রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নোংরা শৌচাগার, কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এর মাত্র দুই দিন পর জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহাম্মদ মুশিউর রহমান হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। তারা ওয়ার্ড, করিডর, রান্নাঘর ও শৌচাগার ঘুরে দেখেন, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানির সংকট নিরসন, দালালচক্র দমন ও সেবার মানোন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানান।

এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু মূল প্রশ্ন রয়ে যায়, এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে?

বাস্তব অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ভিক্টোরিয়া হাসপাতালই শুধু নয়, খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র বহুবার দেখা গেছে। পরিদর্শনের আগে তৎপরতা, পরিদর্শনের সময় দৃশ্যমান পরিবর্তন, আর কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া যেন এক পরিচিত বাস্তবতা।

স্বাস্থ্যসেবার মান কোনো পরিদর্শননির্ভর বিষয় হতে পারে না। প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় কোনো বিশেষ দিনের প্রস্তুতিতে নয়, বরং একজন সাধারণ রোগী বছরের প্রতিটি দিনে কী ধরনের সেবা পান, তার মাধ্যমে। একজন রোগী হাসপাতালে এসে শুধু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং মানবিক আচরণ প্রত্যাশা করেন। এসব নিশ্চিত করা হাসপাতাল প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্ব, বিশেষ কোনো সফরের উপলক্ষ নয়।

এ কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থায়ী জবাবদিহিতার কাঠামো। চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করতে হবে।

একই সঙ্গে শুধু ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল নয়, জেলার সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি পুরো জেলার মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।

পরিবর্তনের দায় শুধু প্রশাসনের নয়। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকেও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি যেমন তুলতে হবে, তেমনি ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে টেকসই করার জন্যও সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে।

একটি শহরের সভ্যতা ও মানবিকতার পরিমাপ হয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা মর্যাদার সঙ্গে চিকিৎসা পায়, তার মাধ্যমে। ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু একটি হাসপাতাল পরিষ্কার করার নয়, পুরো জেলার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও সংস্কারের সুযোগ।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে কয়েক দিনের তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি, কঠোর জবাবদিহিতা এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কার। অন্যথায় মন্ত্রী আসবেন, কর্মকর্তা পরিদর্শন করবেন, কয়েক দিন তৎপরতা চলবে, সংবাদমাধ্যমে প্রশংসা হবে। তারপর আবার সব আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। আর সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবার নামে একই ভোগান্তি, একই হতাশা এবং একই অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে থাকবে।

লেখক: আসমাউল হুসনা (সাংবাদিক)

সর্বশেষ

জনপ্রিয়