২০ জুন ২০২৬

রাকিবুল রাকিব

প্রকাশিত: ২১:২২, ২০ জুন ২০২৬

আপডেট: ২১:৫৬, ২০ জুন ২০২৬

এবার ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে উন্মাদনা এত কম কেন?

এবার ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে উন্মাদনা এত কম কেন?
গত ৩০ এপ্রিল ৭৬তম ফিফা কংগ্রেস কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত হয়। এসময় ফিফা বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বক্তব্য রাখেন। ছবি: রয়টা

কয়েকদিন আগেও চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল ঘিরে যতটা উন্মাদনা ছিল, ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে ততটা উত্তেজনা নাই। দোকানে দোকানে জার্সি, পতাকা কিংবা ফুটবলের বিক্রি জমছে না। মাঠে-ঘাটে ও পথে-প্রান্তরে বিশ্বকাপের সেই চিরচেনা আবহ অনুপস্থিত। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থকদের শো ডাউন সহজে চোখে পড়ছে না। জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা স্পেনের নতুন সমর্থকরাও যেন কুলহারা নৌকার মাঝি।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক তুলনামূলক বেশি। ২০২২ সালে কাতারে লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পর সমর্থকদের মধ্যে তৃপ্তি এসেছে। ফলে অনেকেই এবার বিশ্বকাপ জয়ের প্রশ্নে আগের মতো আবেগি নন।

অন্যদিকে, ব্রাজিল শিবিরে কোচ হিসেবে কার্লো আনচেলত্তির উপস্থিতি প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। যদিও দল গুছাতে বেশি সময় পাননি, তবু তাঁর সাফল্যের রেকর্ড ব্রাজিল সমর্থকদের আশাবাদী করছে।

কিন্তু বর্তমান ব্রাজিল দলের রক্ষণ, মধ্যমাঠ বা আক্রমণভাগ কোনোটিই বিশ্বসেরা নয়, প্রথম ম্যাচে অনেক দূর্বলতা দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের শিরোপা-খরার ক্ষুধা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্রাজিল সমর্থকরা আপাতত নীরব রয়েছেন।

এবার বিশ্বকাপে দল ও ম্যাচ দুটোর সংখ্যাই বেড়েছে। আগের আসরে ৬৪টি ম্যাচ হলেও এবার তা ১০৪টি। পুরো প্রতিযোগিতা চলবে প্রায় ৪০ দিন। প্রতিদিন ৩টির বেশি ম্যাচ থাকায় দর্শকদের মনোযোগ ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সময়ের সঙ্গে অধিকাংশ ম্যাচের সময় না মেলায় আগ্রহ আরও কিছুটা কমেছে।

বিশ্বকাপের গানগুলোও বাজিমাত করতে পারেনি। শাকিরার সঙ্গে আফ্রোবিট তারকা বার্না বয়ের কণ্ঠে ‘দাই দাই’, অপেরা কিংবদন্তি আন্দ্রেয়া বোচেলি, ডেভিড গুয়েটা ও মেগান দি স্ট্যালিয়নের পরিবেশনায় ‘ডিএনএ’ কিংবা লিসা, অনিত্তা ও রেমার গাওয়া ‘গোলস’ গানগুলো সমর্থকদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি করতে পারেনি। এছাড়াও ‘গেম টাইম’ ও ‘পর এয়া’ গান দুটির রেটিং ভালো নয়।

গানগুলোতে রয়েছে অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, সুরের জটিলতা এবং ফিউশনের বাড়াবাড়ি। টিকটক রিলস, ইনস্টাগ্রাম বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমের কথা ভেবে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে। তাই এককভাবে শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু সামষ্টিক উত্তেজনা বা আবেগ তৈরিতে গানগুলো পুরোপুরি ব্যর্থ।

এছাড়া বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির ধীরগতি বিশ্বকাপের জোয়ারে কিছুটা ভাটার কাজ করছে। বাজারে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, বেকারত্ব হু হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশে গত ৩-৪ বছরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। অথচ ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশের যুগে এমনটা প্রত্যাশিত নয়। আবার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সবকিছুই যেন থমথমে। মানুষ আশা-নিরাশার দোলাচলে বন্দি। তাই হয়তো ফুটবল বিশ্বকাপ অর্থ্যাৎ ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বাংলাদেশে আনন্দের ঢেউ তুলতে পারছে না।

ইউরোপ ও আমেরিকায়ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। খ্রিস্টান ও শেতাঙ্গ উগ্রপন্থীদের বাড়-বাড়ন্ত। ইরান যুদ্ধের কারণে আমেরিকায় জ্বালানির দাম অনেক বেশি। বিশ্বজুড়েও জ্বালানির দাম বাড়ছে।

এছাড়া টিকিটেরও বাড়তি দাম। ফলত অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে ফুটবল উন্মাদনার চিরাচরিত রূপটি উধাও।

ফ্লোরিডায় অভিবাসন অধিকারকর্মীরা ফিফার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন সংস্থাগুলোর উপস্থিতি নিষিদ্ধের দাবি জানান। ছবি: রয়টার্স

অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা বা কাতারের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ফুটবলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে গত আসরগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতিতে যেভাবে ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিল, উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে তা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা কানাডার কোথাও জনপ্রিয় খেলা ফুটবল নয়। স্থানীয় ফুটবল লিগ জনপ্রিয় নয়, স্থানীয় তারকা খেলোয়াড় নাই; দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে উত্তেজনা কম।

বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় ব্র্যান্ডিংয়ের কৌশল জোরেশোরে চলেনি বা চললেও তার আঁচ পড়েনি। ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকা যতটা ব্যস্ত, কিউবা দখল করতে ট্রাম্প যতটা মরিয়া, ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করতে মার্কিন প্রশাসন যে পরিমান তৎপর, বিশ্বকাপ ব্র্যান্ডিংয়ে তার সিকিভাগও দেখা যায়নি। উপরন্তু ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব, বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর উপর শুল্ক আরোপ, গাজা গণহত্যায় ইসরায়েলকে সমর্থন বা লেবানন দখলদারিত্বে অস্ত্র প্রদান বিষয়গুলোতে পুরানা বিশ্ব কাঠামো ভেঙ্গে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের চেয়ে এবার ইরান যুদ্ধ কিংবা কিউবা দখলের আলোচনা বেশি। দেশে দেশে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে অস্থিরতার ছাপ। চীন, ভারত, ব্রাজিল, বাংলাদেশ, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সব জায়গাতেই মার্কিন শুল্ক আরোপ, নাহয় যুদ্ধবাজী, অথবা ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবে মানুষ বিরক্ত।

এদিকে, অভিবাসন নীতি কঠোর করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলোর সমর্থকরা খেলা দেখতে ভিসা পাচ্ছেন না। কোনো কোনো দেশের সাংবাদিকরাও ভিসা পাননি। ফিফা স্বীকৃত আফ্রিকার অন্যতম সেরা সোমালি রেফারি ওমর আব্দুল কাদির আরতান বৈধ ভিসা সত্ত্বেও আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারেননি। এমনকি কিছু খেলোয়াড়ও বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার হয়েছেন।

বিশ্বকাপের বড় আকর্ষণ হলো বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের উপস্থিতি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতি, দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই এবং কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর বিধিনিষেধের কারণে বহু সমর্থক ও কর্মকর্তার যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ফুটবলের দীর্ঘদিনের সৌন্দর্য ‘পুরো বিশ্বকে এক সুতায় গাঁথা’ আমেরিকার বিশ্বকাপ আয়োজনে অনুপস্থিত। ফিফাও মার্কিন কাণ্ডকারখানায় একবারেই নীরব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ক্ষমতা চর্চা ও হেজিমনি প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে ফিফা।

তাই দেশে দেশে সাধারণ দর্শক, ভক্ত-সমর্থক ও বিবেকবান মানুষ আমেরিকার সেই ক্ষমতা চর্চা ও হেজিমনি প্রতিষ্ঠার ধরণকে প্রশ্ন করছে এবং ফুটবলের সত্যিকারের সৌন্দর্য ফেরানোর দাবি জানাচ্ছে। বিশ্বকাপ উন্মাদনার ঘাটতি তাই মার্কিন বিশ্ব ব্যবস্থার ধসের ইঙ্গিত দেয়। সর্বত্র ক্ষয়িণ্ষু সভ্যতার মাতবরি নিয়ে সারা দুনিয়া তথা বিশ্ববাসীর আর কোনো আগ্রহ নাই।

লেখক: রাকিবুল রাকিব (অনুবাদক ও ‘পাঠ-চিন্তা’-র সদস্য)

সর্বশেষ

জনপ্রিয়