২২ জুলাই ২০২৬

রাকিবুল রাকিব 

প্রকাশিত: ২২:৪২, ১৮ মে ২০২৬

‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি ভাইরাল হলো কী করে?

‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি ভাইরাল হলো কী করে?

একটি অ্যালবিনো মহিষের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ঘটনাটি ‘রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম’, নারায়ণগঞ্জ, পাইকপাড়ার। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের সেই মহিষটি ভাইরাল হওয়ার অনেক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, তবে বিষয়টি মোটেই নিরীহ নয়। এর ভেতরে রয়েছে বাজার ব্যবস্থার সমীকরণ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার জটিল সম্পর্ক। তাই এটি সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক পাঠের দাবি রাখে।  

মহিষটির গায়ের রং দুধ-সাদা, কোথাও হালকা গোলাপি বা ক্রিম আভাযুক্ত। শরীরে মেলানিন কম থাকায় চোখ, নাক ও ত্বকেও ফ্যাকাশে ভাব রয়েছে। বাংলাদেশে কোরবানির পশুর নাম রাজা, সুলতান, বাদশা, বাহুবলি, টাইগার কিংবা মেসি-রোনালদো রাখা নতুন ঘটনা নয়। তবে এবার অ্যালবিনো মহিষটির নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখার পর, তা অতি দ্রুত ভাইরাল হয়। প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪.কমসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকাও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

খামার কর্তৃপক্ষের দাবি, মহিষটির মাথার সোনালি চুল অনেকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বলে এই নাম দেওয়া হয়। খামারের মালিক জিয়া উদ্দিন মৃধা জানান, “তাঁর ছোট ভাই মজা করে নামটি দিয়েছিল, পরে সেটিই ছড়িয়ে পড়ে।” বিষয়টি বর্ণবাদী বা রেসিস্ট লাগতে পারে, তবে এর সামাজিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর।

প্রাথমিকভাবে এটি একটি মার্কেটিং বা বিপণন কৌশল। আলোচিত অথচ উন্মাদ এক ব্যক্তির নাম দ্বারা মানুষের মনে কৌতূহল জাগানো হয়েছে। আসল উদ্দেশ্য পশু বিক্রি বৃদ্ধি করা। প্রায় ৭০০ কেজি ওজন, সাড়ে তিন বছর বয়স, নিয়মিত গোসল, বিশেষ খাদ্যতালিকা, এসব তথ্য দিয়ে মহিষটি ঘিরে আকর্ষণীয় গল্প ফাঁদা হয়েছে। শোনা গেছে, ঢাকার এক ব্যক্তি মহিষটি ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কিনে নেয়। এর মাধ্যমে জনমানসে এমন ধারণা তৈরি করা হয় যে, খামারের পশুগুলোর চাহিদা অনেক বেশি; দেরি করলে পাওয়া না-ও যেতে পারে। এখনই কিনতে আসুন, নগদে কিনুন। এই কৌশলে ব্যবসায়ী সফল। তিনি অবশ্যই একজন চোসত ব্যবসায়ির তকমা পাবেন।

বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী মার্সেল মস “The Gift” গ্রন্থে আধুনিক বাজারকেন্দ্রিক ধারণার একটি নির্মম সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজে ব্যক্তি মানুষ নিছকই অর্থনৈতিক প্রাণী বা হোমো ইকোনোমিকাস (Homo oeconomicus)। এটি ঐতিহাসিকভাবে মানুষের খুব সাম্প্রতিক বা নতুন অভিজ্ঞতা। যা মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর করে তোলে। অথচ বিকাশের পুরো দীর্ঘ ইতিহাসে মানুষ এরকম ছিল না। 


বিপণন কৌশল ব্যবসায়ির মর্জিমাফিক তৈরি বা সচেতনভাবে ফাঁদা, বিষয়টি তা নয়। পুরো নাটকের একটি দৃশ্য মাত্র। বরং ভাইরাল সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনা ও বানানো গালগল্প মিলেই এক ধরনের বাজারি কৌশল তৈরি হয়েছে। আর সেখানেই পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থার মূল চরিত্র হাজির হয়, সবকিছু পণ্য ও ব্যবসায় পরিণত করা, অর্থ্যাৎ বাজারিকরণ। এই ব্যবস্থার বড় অসুবিধা হলো, এমনকি একটি অবলা প্রাণীও ব্যবসায়িক স্বার্থে স্রেফ পণ্যে পর্যবসিত হয়। 

বিখ্যাত সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন “Capitalism as Religion” প্রবন্ধে সতর্ক করেন, পুঁজিবাদ শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়; বিশুদ্ধ এক ধর্ম। প্রচলিত ধর্ম মানুষের দুশ্চিন্তা ও ভয়ের যে সমাধান দিত, পুঁজিবাদ একই কাজ করে। মানুষের উদ্বেগ ও যন্ত্রণা লাঘব করে। তবে বস্তুগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত হয়। ফলে কোরবানির সত্যিকারের আব্রাহামীয় যে শিক্ষা তা থেকে আমরা দিন দিন বিচ্যুত হচ্ছি। ঈসমাইলীয় কোরবানির ত্যাগ ও বিসর্জনের মহান শিক্ষা আজ এক প্রদর্শনবাদিতার মঞ্চ, জয় পায় বাজার অর্থনীতি তথা পুঁজিবাদ। 

জিনিসটা আরেকটু বুঝতে ক্রিটিক্যাল তত্ত্বের অন্যতম দিকপাল হার্বার্ট মার্কুজে সহায়তা করেন। তাঁর ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ”One-Dimensional Man” গ্রন্থের মূল দাবি ছিল, আধুনিক উন্নত শিল্প সমাজ ও পুঁজিবাদ মানুষকে একমাত্রিক বা চিন্তাশক্তিহীন জড়বস্তুতে রূপান্তরিত করে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ‘ভুয়া চাহিদা’ তৈরি করে। মানুষ শুধুই বস্তুগত সুখের পেছনে ছুটতে থাকে। সমালোচনামূলক ও বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা লোপ পায়। বাইরে থেকে মানুষকে স্বাধীন মনে হলেও, তারা আসলে বিদ্যমান সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অদৃশ্য দাসত্বে বন্দি। তাই বলা যায়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মার্কেটিং বা বিপননের এক চমৎকার কৌশলে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটি ভাইরাল হয়েছে। 

পুঁজিবাদ খারাপ বা ভালো, এই ধরনের ধারণা তৈরি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, পুঁজিবাদ ভালো-মন্দ মিলিয়ে ঐতিহাসিক সমাজ বিকাশের এক বিশেষ দশা।  

এবার বিষয়টি আরেকটু তলিয়ে দেখা দরকার। মহিষটির নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ দেওয়ার মধ্যে বর্ণবাদী প্রবণতা আছে, তবে মূল অভিমুখটি প্রতিবাদী। এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা-কাঠামো ও পূর্ববঙ্গীয় জনমানসের কল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সচেতন নয়, অবচতন মনের প্রয়াস। 

ভাষা, শব্দ বা প্রতীকের অর্থ হঠাৎ তৈরি হয় না; ইতিহাস, রাজনীতি ও ক্ষমতা সম্পর্কের মিশেলে গড়ে ওঠে। যেমন, ১১-১২ শতকে ‘বুর্জোয়া’ শব্দটি একসময় গ্রাম থেকে শহরে আসা, প্রাচীরঘেরা বেষ্টনীর মধ্যে বসবাস করা, ছোটো ছোটো ব্যবসা করা প্যারিসের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বুঝাত। এখন তা বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক পরিচয় বহন করে।

ভিয়েতনামে গবেষণা করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞানী জেমস স্কট দেখিয়েছেন, কৃষকরা সরাসরি বিদ্রোহে সুবিধা করতে পারে না। তাই তাঁরা শাসকের বিরুদ্ধে গুজব, কৌতুক বা ব্যঙ্গ রচনা করে সমাজে শাসকের হেজিমনি দূর্বল করে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও তেমন একটি বিষয় কাজ করছে। তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্ত, আক্রমণাত্মক নীতি, শ্বেতাঙ্গবাদী রাজনীতি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনায় ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের সচেতন মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মারণাস্ত্র প্রদান, তাতে নারী ও শিশুসহ বিপুল মানুষের মৃত্যু, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ এবং লেবাননে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ সমর্থনের খবর বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিত দেখেছে। অনেকের কাছে ট্রাম্প এমন এক ক্ষমতার প্রতীক, যা একইসঙ্গে নিষ্ঠুর এবং প্রহসনমূলক।

গাল্পগল্পের মাধ্যমে মানুষ নিজস্ব কল্পনা ও ভাবনার জগত পুনর্নির্মাণ করে। রাজনীতি সচেতন হয় এবং ‘নিজ ও অপর‘ ভেদরেখা চিহ্নিত করে। ফলে ট্রাম্প হচ্ছেন সেই ‘অপর’ যাকে মহিষ বানিয়ে হাস্যরস, এক ধরনের দ্যোতনা তৈরি করছে।

গত দুই-আড়াই বছরে গাজায় ৭০ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে। অসংখ্য লোক আহত ও উদ্বাস্তু জীবনে পতিত হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫০ ভাগ নারী ও শিশু রয়েছে। বিগত ১১ই মে মার্কিন সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্তফ ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় লেখা একটি নিবন্ধে দেখান, ইসরাইলি বন্দীশালায় ফিলিস্তিনি পুরুষ অস্বাভাবিক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ফলে পূর্ববঙ্গের জনসমাজ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসেবে ঘটনাগুলোতে সম্প্রদায়গত ক্ষোভ ও অপমান অনুভব করে। সেই ক্ষোভের  প্রকাশ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ । 

মার্কিন সাম্রাজ্যের এখন পতনকাল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর, এই প্রথম বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর উত্থানে আমেরিকা শঙ্কিত। সারাবিশ্বে দেশটি অস্থিরতা তৈরি করছে। কিউবা, ভেনিজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য সর্বত্রই। তাই সম্ভবত, “The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte” গ্রন্থে কার্ল মার্ক্স কথাটি আগাম টুকে রাখছিলেন, ইতিহাস প্রথমে ট্রাজিডির আকার পায়, আর শেষে প্রহসনে রূপ নেয়। বর্তমানে মার্কিন আমেরিকার প্রহসনের কাল চলছে, উন্মাদ ট্রাম্প যার শেষ ভরসা। চীনের অর্থনৈতিক স্ফীতি দেখে তারা আজ দিশেহারা। 

বৃহৎ বাঙালি জনসমাজ সেগুলো বুঝতে পারছে। ফলে তারা সামাজিক-সাংস্কৃতিক এক অস্ত্র অজান্তে, আনমনে কিংবা আচমকা হাতে তুলে নেয়, যা মার্কিন নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত নীতিনিষ্ঠ বা রুল বেসড বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক চরম ঠাট্টা। 

অ্যালবিনো মহিষ উত্তর আমেরিকার লাকোটা, ডাকোটা ও নাকোটা আদিবাসীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র প্রতীক। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষ শান্তি, সমৃদ্ধি ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে। তাঁদের প্রধান দেবীও কোনো একদিন পৃথিবীতে ফিরে আসবে ওই বিশেষ মহিষের রূপে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই মহিষ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করার এক মোক্ষম প্রতীক।

ট্রাম্প জাতিসংঘের ২(৪) নং অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে ইরান যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একে একে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেন, একটি বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে দেড়শোর বেশি শিশুকে হত্যা করেন, হাসপাতালে ক্রমাগত হামলা করেন। যাতে ইরানের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তিনি পৃথিবীর মানচিত্র হতে ইরানি সভ্যতা মুছে ফেলার হুমকি দেন। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের জনসমাজে ট্রাম্পের উন্মাদ ও হঠকারী ইমেজ বা ছবি তৈরি করে।  

আর যখন কেউ একজন ট্রাম্পকে ‘মহিষে’ পরিণত করল, সেটি দ্রুত পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষ ঠিক এরকম একটি প্রতীক বা ভাষার জন্যই মুখিয়ে ছিল। গণমানুষ হয়তো ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পারে না, কিন্তু তাদের টিটকারি, ব্যঙ্গ ও অভিশাপ কম শক্তিশালী নয়। তারা গালগল্পের মাধ্যমে অনেক সময় নেতার মহান মূর্তি তৈরি করে, আবার তারাই মহান নেতার মহান মুখোশ তাসের ঘরের মতো ধসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষটির ভাইরাল হয়ে ওঠার অন্তর্নিহিত কারণ এখানেই। 

লেখক: রাকিবুল রাকিব-অনুবাদক ও সদস্য, পাঠচিন্তা

সর্বশেষ

জনপ্রিয়