১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯:২৬, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৯:২৮, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিরল ‘ময়াময়া’ রোগে থেমে গেছে মিমের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন

বিরল ‘ময়াময়া’ রোগে থেমে গেছে মিমের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন

সারাদিন চুপচাপ বসে থাকা। কখনো শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, আবার কখনো একা একাই কথা বলা। ঠিকমতো ঘুমও হয় না। মাঝেমধ্যে চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায়। কখনো অসুস্থতার কারণে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন, এমনকি মাকে মারধরও করেন। ২৩ বছর বয়সী মেহরুন্নেসা মিমের দিন কাটছে এভাবেই।

অথচ কয়েক বছর আগেও জীবনটা এমন ছিল না। পড়াশোনা করে একদিন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন নারায়ণগঞ্জের বন্দরের বাগবাড়ি এলাকার এই তরুণী।

২০১৮ সালে নবীগঞ্জ গার্লস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন মিম। পরে বন্দর সরকারি কদমরসূল কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপরই বদলে যেতে থাকে তার জীবন।

শুরুতে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে ব্যথার তীব্রতা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে ছুটতে থাকেন মা শিউলি বেগম। পরে জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মিমের শরীরে ধরা পড়ে বিরল রোগ ময়াময়া।

২০২৫ সালে মিমের অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে অস্ত্রোপচারের পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপরও বেশ কয়েকবার মাইনর স্ট্রোক হয়েছে তার। বর্তমানে মাঝেমধ্যে চোখে দেখতে পান না। দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থারও অবনতি হচ্ছে।

ময়াময়া কী

ময়াময়া একটি বিরল মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান কিছু রক্তনালি ধীরে ধীরে সরু হয়ে যেতে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। শরীর তখন বিকল্প পথে রক্ত সরবরাহের জন্য ছোট ছোট রক্তনালির জাল তৈরি করে। বিশেষ ধরনের মস্তিষ্কের ইমেজিংয়ে এই রক্তনালির জাল ধোঁয়ার কুণ্ডলির মতো দেখা যায়।

রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে এ রোগে স্ট্রোকসহ বিভিন্ন স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। রোগটি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তুলনামূলক বেশি দেখা যায় এবং নারীদের মধ্যে এর প্রবণতাও বেশি বলে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা জানান।

বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজিউর রহমান বলেন, ‘ময়াময়া অত্যন্ত বিরল একটি রোগ। বাংলাদেশেও এ রোগীর সংখ্যা খুবই কম। নারায়ণগঞ্জ জেলায় এমন রোগীর রেকর্ড আমার জানা নেই। পূর্ব এশিয়ার মানুষের মধ্যে রোগটির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি এবং পুরুষের চেয়ে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হারও বেশি দেখা যায়।’

মিমের চিকিৎসায় যুক্ত নিউরোসার্জন ডা. মোহাম্মদ সামসুল আরেফিন বলেন, মিম বিরল ময়াময়া রোগে আক্রান্ত। এ রোগ সম্পর্কে অনেক চিকিৎসকেরও বিস্তারিত ধারণা নেই। মিমকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মিমের যে সার্জারি করা হয়েছে, তার আগে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত ক্ষতি না হয়ে থাকলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।

মেয়ের চিকিৎসায় নিঃস্ব মা

মিমের চিকিৎসার পাশাপাশি কঠিন হয়ে উঠেছে তার মা শিউলি বেগমের জীবনও। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের বিয়ের স্বর্ণালংকার ও ঘরের আসবাবপত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।

পরিবারের দাবি, মিম ও তার বাবা মামুনের চিকিৎসায় তাদের প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মিমের বাবা ২০২০ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর গত বছর মারা যান।

চার বোনের মধ্যে মিম দ্বিতীয়। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সিফা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। বর্তমানে মা, মিম ও ছোট বোনকে নিয়েই কোনোভাবে চলছে সংসার।

স্থানীয়দের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করেন। মেয়ের জামাইও সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা করেন। সেই সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই চলছে সংসার ও মিমের চিকিৎসা।

থেমে গেছে পড়াশোনা

মিম এখন ঠিকমতো কথা বলতেও পারেন না। দিনের বড় একটি সময় একা বসে থাকেন। কখনো নিজের সঙ্গে কথা বলেন, আবার কখনো নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন।

যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে মিমের দিন কাটছে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে।

একসময় বই-খাতা নিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এইচএসসি পাস করার পর সেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ময়াময়া রোগ তার পড়াশোনা থামিয়ে দিয়েছে।

এখন তার পরিবারের সবচেয়ে বড় চাওয়া মিম যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান এবং যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে পরিবার।

মিমের পরিবারের আশা, প্রয়োজনীয় ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। আবারও বই-খাতা হাতে নিয়ে পড়াশোনায় ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে তার।

একসময় যে মেয়েটি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, আজ তার জীবনের বড় অংশ কেটে যাচ্ছে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে। তার পরিবারের আকুতি—সহযোগিতার মাধ্যমে যদি মিম প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ পান, তাহলে হয়তো থেমে যাওয়া জীবনের পথচলা আবারও শুরু হতে পারে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়