খানপুর টার্মিনাল: সম্ভাবনার আড়ালে নগর সংকট
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রস্তাবিত খানপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালকে ঘিরে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়বে, সড়কের ওপর চাপ কমবে—এমনটাই বলা হচ্ছে। কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এই প্রকল্পই শহরের জন্য নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে। তবে এই প্রকল্পের মূল সংকট—সংযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা।
টার্মিনালে আসা কনটেইনার শেষ পর্যন্ত শহরের ভেতরের সড়ক ব্যবহার করেই গন্তব্যে পৌঁছাবে। অথচ এসব সড়ক এমনিতেই সরু, পর্যাপ্ত নয় এবং দীর্ঘদিনের যানজটে জর্জরিত। চাষাড়া, খানপুর রোড, মিশনপাড়া কিংবা ওয়াটার ওয়ার্কস—সবখানেই একই চিত্র। এই অবস্থায় ভারী ট্রাক ও ট্রেইলারের চাপ যুক্ত হলে নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হতে পারে চাষাড়া মোড়কে ঘিরে। এটি এমনিতেই শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত ও জটপূর্ণ এলাকা। কনটেইনার পরিবহনের চাপ যুক্ত হলে এটি স্থায়ীভাবে যানজটের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো শহরের চলাচল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে।
পরিকল্পনার আরেকটি বড় দুর্বলতা—সমন্বয়ের অভাব। টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলা হলেও, এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন, বাইপাস বা ভারী যানবাহনের জন্য আলাদা রাস্তা নিয়ে দৃশ্যমান কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যদি এই প্রকল্প চালু করা হয়, তাহলে তা সমস্যাকে বহুগুণ বাড়াবে।
পরিবেশগত দিকও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শীতলক্ষ্যা নদী ইতোমধ্যেই দূষণের চাপে রয়েছে। নতুন করে কার্গো কার্যক্রম, বর্জ্য ও তেল-গ্রিজ নিঃসরণ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বায়ু ও শব্দদূষণ, যা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রশ্ন রয়েছে। দেশের অন্য অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নৌসংযোগ ও শক্তিশালী সড়ক নেটওয়ার্ক। এই দুইয়ের সমন্বয় না হলে বিনিয়োগের সুফল মিলবে না। বিশেষ করে পানগাঁও আইসিডির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সড়ক জট ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতি এই শঙ্কাকে আরও জোরালো করে। প্রাথমিকভাবে ব্যয় বাড়িয়ে ৬১৫.৭৫ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদন না পেয়ে পরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ১৮৪ কোটি ৯১ লাখ টাকায় সংশোধিত প্রকল্প হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে একনেক থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়ে ঠিকাদার নিয়োগও সম্পন্ন হয়েছে, এবং প্রকল্পের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে বাস্তব নির্মাণ অগ্রগতি এখনো অত্যন্ত সীমিত।
এই ব্যয়ের ওঠানামা, দীর্ঘসূত্রতা এবং ধীরগতির বাস্তবায়ন প্রশ্ন তুলছে—পরিকল্পনা কতটা পরিপক্ব ছিল, এবং বাস্তবায়ন কতটা প্রস্তুত অবস্থায় শুরু হয়েছে।
খানপুর টার্মিনালকে সরাসরি কোনো মহাসড়ক বা আঞ্চলিক সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা, শহরের বাইরে দিয়ে বাইপাস নির্মাণ এবং ভারী যানবাহনের জন্য আলাদা করিডোর বা রাস্তা তৈরি—এই পদক্ষেপগুলো ছাড়া প্রকল্পটি টেকসই হবে না। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা নাগরিক জীবনে স্বস্তি আনে। এই প্রকল্প সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হবে, নাকি পরিকল্পনার ঘাটতিতে নতুন নগর সংকটের সূচনা—সেই সিদ্ধান্তের সময় এখনই।





































