হকারির ওপর ‘নাগরিকগিরি’ বন্ধ করুন
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ শহরে হকার উচ্ছেদই ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। কিন্তু দ্রুতই বিষয়টি নীতিগত বিতর্ক থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তৎকালীন সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই হয়ে ওঠে মুখ্য, ফলে হকার উচ্ছেদের মূল প্রশ্নটি আড়াল হয়ে যায়।
১৭ জানুয়ারি ২০১৮-এ প্রথম আলো জানায়, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ‘হকারমুক্ত ফুটপাত চাই’ স্লোগান নিয়ে চাষাঢ়ার দিকে এগোচ্ছিলেন আইভী। তখন সায়েম প্লাজার দিক থেকে তার সমর্থকদের ওপর বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছোড়া হয়, এমনকি পিস্তল উঁচিয়ে ফাঁকা গুলিও ছোড়া হয়।” এই বর্ণনাই সংঘাতের তীব্রতা বোঝাতে যথেষ্ট।
এবারও শহর আবার হকার উচ্ছেদ ইস্যুতে সরব। তবে আগের সেই বহুল আলোচিত ‘রাম-রাবণ’ দ্বন্দ্বে মাঠের প্রধান খেলোয়াড়রা অনুপস্থিত, ক্ষমতার ভারসাম্য একদিকে ঝুঁকে আছে। তাই পরিস্থিতি আগের মতো বিস্ফোরক না হলেও শহর এখনো এক ধরনের গুমোট উত্তেজনার ভেতরেই আছে।

হকারের অবদান
সারা দেশেই, বিশেষ করে শহরগুলোতে, হকাররা এক বিস্তৃত ভাসমান অর্থনৈতিক জালের অংশ। তারা বা তাদের ভোক্তারা কোনো বিচ্ছিন্ন বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী নয়, বরং নগরজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। নারায়ণগঞ্জ শহরটিও এমনই এক জাল, পোশাকশিল্পের শ্রমিক, রিকশা-ভ্যান-সিএনজি চালক, রাজমিস্ত্রি, নিরাপত্তা কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, গৃহকর্মী, ডেলিভারি ম্যান, দিনমজুর বা ফেরিওয়ালারা মিলে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করে। এই পরিসরই হকারদের বিক্রি-বাট্টাকে সচল রাখে এবং তাদের অবস্থানকে পোক্ত করে।
পরিসংখ্যান যাই বলুক, শ্রেণি হিসেবে হকাররা মূলত প্রান্তিক ও নিঃস্ব। কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে, কেউ কেউ বড় পুঁজি বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাদের অবস্থান দুর্বলই থেকে যায়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং এস্থার দুফলো তাদের “Poor Economics: A Radical Rethinking of the Way to Fight Global Poverty” বইয়ে দেখিয়েছেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি দরিদ্র মানুষের জন্য এক ধরনের সুরক্ষা কবচ। বিকল্প বেতনভিত্তিক কাজের সুযোগ না থাকায় তারা সামান্য পুঁজি নিয়ে রাস্তায় পণ্য বিক্রির পথ বেছে নেয়।
তারা আরও বলেন, হকাররা টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ (sophisticated economics) করে, এক ধরনের পরিশীলিত অর্থনীতি চর্চা করে। সরকারের ভুল নীতি এবং ঋণের উচ্চ সুদের হার, তাদের এই মেধা শুধু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অবশিষ্ট থাকে, প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে না।
ব্র্যাক-এর এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% কর্মশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। শুধু ঢাকাতেই হকারের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীই প্রতিদিনের নগর অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং শহরের সেবাব্যবস্থাকে কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হকার বাড়ছে
ষাটের দশকে নরম্যান বোরল্যাগের তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’গ্রামীণ পরিবেশ, জীবিকা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করে। কৃষিনির্ভর একঘেয়ে জীবনের ভেতর থেকে বের হয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সাময়িক উন্নতির আশায় মানুষ গ্রাম থেকে শহরের দিকে আসতে থাকে।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% এবং চরম দারিদ্র্য ৫.৬%। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, ২০২৪ সালে দেশে ২৭ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭৩%, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে ১০.০৩% হয়েছে। (অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০২৪) এর ওপর কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও তীব্র করেছে। ফলে শহরমুখী প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।
খাতভিত্তিক অবদান দেখলেও একই চিত্র পাওয়া যায়, কৃষি খাতের অবদান মাত্র ১১.০২%, শিল্প ৩৭.৯৫% এবং সেবা খাত ৫১.০৮%। (অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০২৪) শিল্প ও সেবা খাত যেহেতু শহরনির্ভর, তাই কাজের খোঁজে মানুষকে শহরে আসতেই হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু ঝুঁকি রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে ১৩তম। ফলে উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ ক্রমেই শহরে চলে আসছে, এবং তাদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে।
এদিকে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ নেমে এসেছে ১.২৭ কোটি মার্কিন ডলারে, যেখানে ২০২২ সালে ছিল ১.৫২ কোটি ডলার। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাও এখানে প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে এই বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতা একটি দিকেই ইঙ্গিত করে, হকারের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও বছরে ঠিক কতজন নতুন করে হকার পেশায় যুক্ত হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই।

গরীব হকার ও নাগরিকগিরি
বহুদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নাগরিক সমাজ দাবি করে আসছে, ফুটপাত দিয়ে চলাচল নাগরিক অধিকার এবং এই অধিকার ক্ষুণ্ণ করা অবৈধ। তাদের যুক্তি, হকাররা ফুটপাত দখল করে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করছে; ফলে তালবাহানা না করে উচ্ছেদই একমাত্র সমাধান। একই সঙ্গে বলা হয়, এই দখলই শহরে যানজট সৃষ্টি করে, নগরজীবনকে অচল করে দেয় এবং ভোগান্তি বাড়ায়। অন্যান্য যুক্তি থাকলেও সেগুলো মূলত গৌণ।
কিন্তু আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। পুরো বিষয়টি ‘হকার বনাম নাগরিক’, এই বাইনারিতে ফেলে দেখা হচ্ছে। অথচ যারা হকার, তারাও তো নাগরিক। শুধু নগরে বসবাস করলেই নাগরিক হয়, এই ধারণা অনেক পুরনো এবং সংকীর্ণ। এই ধরনের বিভাজন হকারদের এক ধরনের অবজ্ঞার জায়গায় ঠেলে দেয়, তাদেরকে সমাজের নিচু স্তরের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে।
তবে এই চর্চা নতুন কিছু নয় যে, শহরে হকারদের জীবন-জীবিকা ও সিদ্ধান্তকে গৌণ করে দেখা হয়। তাদের হয়ে বলার মতো শক্তিশালী কোনো কণ্ঠ থাকে না, না গণমাধ্যমে, না বুদ্ধিজীবী সমাজে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, শিক্ষা-দীক্ষার সীমাবদ্ধতা, সংগঠিত শক্তির অভাব এবং ক্ষমতার সঙ্গে এক অদ্ভুত নির্ভরশীল সম্পর্ক থাকায় তারা গণতান্ত্রিক দরকষাকষিতে পিছিয়ে পড়ে।
মূল সংকটটা কাঠামোগত। শহরের নাগরিক পরিসরে হকাররা কোন ভাষায়, কোন প্রক্রিয়ায় তাদের দাবি তুলবে, সেই পথটাই প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শেষ পর্যন্ত তাদের সামনে থেকে যায় চরম ঝুঁকির পথ, আল্লাহর নামে জীবন বাজি রেখে এক ধরনের ‘ঐশী সংঘাত’ তৈরি করা ছাড়া বা সংঘাতে প্ররোচিত হওয়া ছাড়া দাবি আদায়ের কোনো পথ তাদের জন্য খোলা থাকে না। আর এই সংকটের সন্তোষজনক সমাধান না হলে, সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
হকারদের বিপরীতে শহরে প্রায়ই একটি শক্তিশালী ক্ষমতাজোট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যারা পুনর্বাসনের দায় না নিয়েই, কিংবা সামান্য হামদরদি ভাব করে উচ্ছেদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার নারায়ণগঞ্জ শহরে খালি চোখেই তার উদাহরণ দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সংগঠন, সুশীল সমাজ এবং প্রশাসনের লোকজন মিলেমিশে হকার উচ্ছেদে নেমে পড়ে। পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল চাষাড়ায় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বুলডোজার, ডাম্প ট্রাক, ভেকুসহ নানা যানবাহন নিয়ে জড়ো হন; সঙ্গে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, র্যাব, স্কাউট সদস্য এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। পুরো ঘটনাটা অনেকটা ঘটা করে ঢোল পিটিয়ে ঘটানো হল। যেখানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে কথিত ‘গণমাধ্যম’ নিজের দায়িত্ব দেখাতে ব্যর্থ হল।
বার্নার্ড উইলিয়ামস কোনো সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েছিলেন,
১. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ধারাবাহিকভাবে চিন্তা করা
২. ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে কি না যাচাই করা
৩. পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও নেতিবাচক দিক বিশ্লেষণ করে সময়মতো সংশোধন করা।
এই মানদণ্ডে দেখলে সিটি কর্পোরেশনের হকার উচ্ছেদ অভিযানটি কাকতালীয় ও অগোছালো মনে হয়। ধারাবাহিক ও বহু অংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনার কোনো স্পষ্টতা নেই; সুনির্দিষ্ট চিন্তা ও সম্পদের ম্যাপিং ছাড়া হঠাৎ করে অভিযান চালানো হয়েছে। অথচ নাগরিক সমাজও এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে তেমন প্রশ্ন তোলে না। বিপরীতে প্রান্তিক ও গরীব মানুষগুলোকে ‘শত্রু’ আকারে দাগানো হল।
গভীরে গেলে বোঝা যায়, হকার উচ্ছেদ আসলে বিদ্যমান হকার রাজনীতি ও অর্থকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর একটি কৌশল, যেখানে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র ও প্রান্তের এক ধরনের যোগসাজশ কাজ করে। বাস্তবতা হলো, বর্তমান জনমিতিক ধারা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো হকার উচ্ছেদকে স্থায়ীভাবে সম্ভব করে না। সবাই জানে, শহরের সমস্যার তালিকায় হকার একমাত্র নয়; বরং শহর বহু সমস্যায় জর্জরিত।
আরেকটু তলিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে প্রভাবশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার এখনও পুরোপুরি সুসংহত নয়। বিভিন্ন জায়গায় হকার উচ্ছেদ করে নাগরিক বাহবা কুড়ানো এবং গণমুখী ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রান্তিক গোষ্ঠীর ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে এক ধরনের পপুলিস্ট রাজনীতির চর্চা হচ্ছে, যাতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোকে না খেপিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করা যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, এই ধরনের উচ্ছেদমূলক পদক্ষেপ জুলাই অভ্যুত্থানের সংহতির সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। হকারি বা হকার যদি সমস্যা হয়, তার সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা উচ্ছেদ বা উস্কানির মাধ্যমে নয়। দরকার সুচিন্তিত, ধারাবাহিক ও অংশগ্রহণমূলক নীতি; অস্পষ্ট ও বিমূর্ত পুনর্বাসন নয়।

হকার ও শক্তিশালী গণতন্ত্র
আরেকটি বিষয় হলো, নাগরিক সমাজ ও রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায় হকারদের ক্ষেত্রে ‘উচ্ছেদ’ শব্দটির হরহামেশা ব্যবহার চোখে পড়ে। এর ইংরেজি সমান্তরাল, Eviction, Eradication, Uprooting সমাজবিজ্ঞানে অধিকাংশ সময়ই নেতিবাচক অর্থ বহন করে। বাংলায় ‘উচ্ছেদ’অনেক ক্ষেত্রে জঞ্জাল বা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সরিয়ে ফেলার ধারণা দেয়। ফলে নগরায়ণ ও উন্নয়নের নামে যখন গরিব মানুষকে বস্তি বা আশ্রয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সেটি ‘শহর পরিষ্কার’করার ভাষায় বৈধতা পায়। আসলে এটি একটি ক্ষমতার সম্পর্ক, যেখানে শক্তিশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষকে সরিয়ে দেয়। সিটি কর্পোরেশন যখন হকার উচ্ছেদের মাধ্যমে শহরকে ‘গ্রিন ও ক্লিন’করার কথা বলে, তখন সেই একই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়।
তবে হকার উচ্ছেদ অন্তত তিনটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, আইএলও কনভেনশন ১৯০, মানবাধিকার সনদের ২৩ নম্বর ধারা এবং জাতিসংঘ-এর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১১। ২০১৫ সালে গৃহীত এই লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও টেকসই নগর গড়তে ভঙ্গুর সম্প্রদায়ের পুনর্বাসন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
গায়েত্রী স্পিভাক তাঁর ‘চিন্তার দূর্দশা ’গ্রন্থে বলেছিলেন, গণতন্ত্র মানে শুধু নিজের অধিকার নয়, অন্যের অধিকার স্বীকার করার সক্ষমতা। অথচ গরিব, নিঃস্ব ও উদ্বাস্তু হকারদের অধিকার অস্বীকার করে আমরা বাহ্যত গণতন্ত্রকেই অস্বীকার করি। একবারও ভাবা হল না বা আমতা আমতা ভাবা হল, তারা কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে, কীভাবে সন্তানদের শিক্ষার খরচ বহন করবে। সমাজবিজ্ঞানে ‘পারিপার্শ্বিক চাপ’ (Concomitant Effect) বলে একটি ধারণা আছে, এর অর্থ একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নতুন নতুন সমস্যার জন্ম দেয়া। হকার উচ্ছেদ তারই উদাহরণ হতে পারে।
এতে অনেকে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়তে পারে, নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়তে পারে, স্কুল থেকে বাচ্চারা ঝরে পড়বে, কিংবা আয় কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপে কেউ কেউ আত্মহত্যার চরম সিদ্ধান্তও নিতে পারে। অথচ ইবনে বতুতার ভাষায়, এক সময় ‘সম্পদে পূর্ণ নরকের মতো গ্রাম’যখন বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপে ভেঙে পড়ে, তখন শহরই হয়ে ওঠে গরিব, নিঃস্ব ও বেকার মানুষের শেষ আশ্রয়।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণতন্ত্র দুর্বল থাকার এটিও একটি কারণ। এখানে ‘নাগরিক সমাজ’অনেক সময় গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বার্থে আবদ্ধ থাকে, সংকীর্ণ নৈতিকতা ও ঔপনিবেশিক চিন্তার প্রভাব বহন করে। ফলে তা গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে ‘নাগরিক সমাজ’শব্দটির চেয়ে ‘গণমানুষ’ধারণাটি অনেক বেশি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক। শক্তিশালী গণতন্ত্র শুধু আইনের শাসন, স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতার উপস্থিতি নয়; প্রান্তিক মানুষের জন্য ন্যায় নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয় না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে তাই কেবল আইনি কাঠামো হিসেবে নয়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দেখতে হবে।
মওলানা ভাসানী ‘হক’আদায়ের রাজনীতি করতেন। তার এই দর্শন শুধু অধিকার দাবি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের স্বরকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার এক সচেতন প্রচেষ্টা ছিল। ‘হক আদায়ের রাজনীতি’মূলত সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের বেঁচে থাকা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে একটি সুষম বণ্টনভিত্তিক সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যেই তিনি ‘হক’আদায়ের কথা বলতেন।
এছাড়া ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘হক’পালনের দুটি প্রধান ধারা রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম ‘হাক্কুল ইবাদ’, অর্থাৎ বান্দার হক। মওলানা ভাসানীর ভাবনার সঙ্গে এই ধারণার একটি স্পষ্ট সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। হাক্কুল ইবাদ মূলত মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বকে বোঝায়, অর্থাৎ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, শোষণ থেকে বিরত থাকা এবং সবার প্রাপ্য অধিকার আদায় করা। এই ন্যায্যতা ও মানবিক দায়িত্ববোধই হাক্কুল ইবাদের ভিত্তি। গণতন্ত্র নামক জটিল ধারণার সাথে ‘হক’ আদায়ের ধারণাটি যুক্ত থাকলে বাংলাদেশের মতো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র শক্ত ভিত পাবে।

হকার সমস্যা সমাধান
হকার সমস্যা নিরসনে সিঙ্গাপুর ৭০ ও ৮০-এর দশকে জাতীয় পরিবেশ সংস্থা গঠন করে কার্যকর উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও হংকং-এ হকার ব্যবস্থাপনায় সুসংগঠিত কাঠামো রয়েছে। পাশ্ববর্তী ভারত সরকার “দ্য স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-২০১৪” প্রণয়ন করেছে, যেখানে প্রশংসাপত্রপ্রাপ্ত হকারদের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না। প্রতি শহরে “টাউন ভেন্ডিং কমিটি” গঠন বাধ্যতামূলক, যা বিক্রেতা জরিপ, আইডি কার্ড প্রদান এবং হকিং জোন নির্ধারণ করবে। আইনটি স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও অঞ্চলও নির্ধারণ করে। ইউরোপেও দীর্ঘদিন ধরে দায় স্বীকারমূলক ও দায়িত্বশীল পদ্ধতিতে (Apologetic) এই সমস্যার মোকাবিলা করা হয়েছে।
আশার কথা, ড্যাপ (২০২২-৩৫) ফ্রেমওয়ার্কে হকারদের নিয়ে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ দিক উল্লেখ আছে, যা তাৎক্ষণিক কিছু সমাধান দিতে পারে। তবে বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য সিটি কর্পোরেশনকে নিজস্ব একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে,
১. হকার ও শহরের বাসিন্দা, এই দুই পক্ষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. নগরবিদ, গবেষক, হকার, নাগরিক, প্রশাসক ও প্রভাবশালী পক্ষগুলোকে নিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে; যেখানে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে সনদ প্রদান, স্থান ও সময় নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, নিয়মিত তদারকি ও শাস্তির বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩. আইএলও, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউএনডিপি ও ইউনেস্কো-র মতো সংস্থার কাছ থেকে পরিকল্পনা ও অর্থায়ন সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
৪. কর্পোরেশনকে কার্যকর ও জনবান্ধব করতে মেধাভিত্তিক পদ্ধতিতে নতুন লোকবল নিয়োগ করতে হবে।
মোদ্দাকথা, জনমিতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা হকার সমস্যা সমাধানকে কঠিন করে তোলে। তবু সিটি কর্পোরেশন যদি সত্যিকার অর্থে সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছাতে চায়, তাহলে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর ফ্রেমওয়ার্ক অপরিহার্য।
লেখক: রাকিবুল রাকিব, অনুবাদক ও গবেষক





































