০৩ আগস্ট ২০২৬

এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল

প্রকাশিত: ২০:১৭, ১২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা সনের জন্মকথা

বাংলা সনের জন্মকথা

বাংলা ভাষা যেমন আমাদের সম্পদ, তেমনি বাংলা সন এবং শুভ নববর্ষ আমাদের জাতীয় সম্পদ। পৃথিবীর যে কোনো জাতির পূর্ণতার অন্যতম উপাদান হচ্ছে তার নিজস্ব দিনপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার। আমাদের অহংকার এই বাংলা সন, যা নববর্ষের সূত্রে বাঙালি জাতিকে বেঁধে দিয়েছে এবং সম্রাট আকবর বাঙালি জাতির কাছে অম্লান হয়ে আছেন।

বাংলা সন হলো আমাদের জাতির একটি অলংকার, যা আমাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। পহেলা বৈশাখ—নববর্ষে আমাদের প্রাণে এক নতুন আলো সঞ্চারিত হয়, হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হয় বন্ধুত্বের আবেগ। আমাদের চারপাশে একদল মানুষ আছে, যারা না জেনে, না বুঝে আমাদের প্রজন্মকে ভুল বোঝাতে নববর্ষের নানা আয়োজন-অনুষ্ঠান সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা প্রচার করে থাকে।

১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ এবং আরবি হিজরি ৯৬৩ সন থেকে বাংলা সনের পদযাত্রা শুরু। চলতি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের বয়স ৪৭০ বছর। অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে—সনের আবার বয়স কীভাবে হয়?

দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে মোগল গোত্রগুলো দিল্লির সিংহাসন দখল নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। উত্তরাধিকার সূত্রে যুবরাজ আকবর সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে তাকে হত্যার গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে মা হামিদা বেগম ও ফুফু গোলবদন এক রাতে তাকে ছদ্মবেশে প্রাসাদ থেকে বের করে নিয়ে যান। পরে প্রধান সেনাপতি বৈরাম খানের অনুগত সৈন্যদের নিরাপত্তায় দূরবর্তী এক জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া হয়। সেখানে ইটের তৈরি সিংহাসনে আকবরকে সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বৈরাম খানের বিচক্ষণতায় আকবর ১৩ বছর বয়সে রাজকীয় আড়ম্বরে দিল্লির সিংহাসনে বসেন।

সাহসী যোদ্ধা, সাম্রাজ্য বিস্তার, দক্ষ শাসনব্যবস্থা এবং সংস্কৃতির প্রসারে ৩০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সন-তারিখের হিসাব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। কারণ তখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন সনের প্রচলন ছিল—যেমন: বিক্রম সন, শালীবাহন সন, জালালী সন, গুপ্তাব্দ, লক্ষ্মণ সন ইত্যাদি। এদের অধিকাংশই ছিল চন্দ্র সন।

চন্দ্র সনে এক পূর্ণিমা থেকে পরবর্তী অমাবস্যা বা এক অমাবস্যা থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়কে এক মাস ধরা হয়। চন্দ্র বর্ষ সাধারণত ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায় সম্পন্ন হয়।

আরবি হিজরি সনও একটি চন্দ্র সন। হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে এই সনের প্রচলন হয়। অন্যদিকে, সৌর সনে এক বছর পূর্ণ হতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা, যা চন্দ্র সনের তুলনায় প্রায় ১১ দিন বেশি।

মোগল আমলে দরবারে হিজরি সন প্রচলিত থাকায় খাজনা আদায়ে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ চন্দ্র সন প্রতি বছর এগিয়ে যায়, কিন্তু ফসলের মৌসুম একই থাকে। ফলে প্রজাদের জন্য খাজনা পরিশোধে অসুবিধা তৈরি হয়।

এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর তাঁর সভাসদ ফতেহউল্লাহ শিরাজীকে নির্দেশ দেন হিজরি সন, ফসলি মৌসুম এবং প্রচলিত সনগুলোর সমন্বয়ে একটি নতুন সৌর সন প্রবর্তনের জন্য।

‘আইন-ই-আকবরী’ থেকে জানা যায়, সম্রাট এমন একটি বিজ্ঞানসম্মত ও ত্রুটিমুক্ত সন চালু করতে চেয়েছিলেন, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় ছিল হিজরি ৯৬৩ সন। এই সনকে ভিত্তি করে সৌর সনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলা সনের সূচনা হয়। সেই হিসেবে বাংলা সন ধারাবাহিকভাবে গণনা হয়ে আজ ১৪৩৩ সালে পৌঁছেছে।

১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্যবধান ৪৭০ বছর। এই ৪৭০ বছরের সঙ্গে হিজরি ৯৬৩ যোগ করলে দাঁড়ায় ১৪৩৩ বাংলা সন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইংরেজি ১৪ এপ্রিলের সঙ্গে বাংলা ১লা বৈশাখ এমনভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে প্রতি বছর এই তারিখে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়।

নববর্ষ আমাদের জীবনে নতুন দিনের বার্তা বয়ে আনুক, দূর হোক হিংসা-বিদ্বেষ।

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩

লেখক: এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল
বিশিষ্ট রাজনীতিক ও আইনজীবী

সর্বশেষ

জনপ্রিয়