২৬ অক্টোবর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:৪৪, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

উচ্ছেদে বাধা, ফের দখল: নারায়ণগঞ্জে হকার সমস্যার সমাধান কোথায়?

উচ্ছেদে বাধা, ফের দখল: নারায়ণগঞ্জে হকার সমস্যার সমাধান কোথায়?

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত রাখতে আবারও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছে সিটি করপোরেশন। রোববার রাতে হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন হকাররা। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তবে এ ঘটনা নতুন নয়। বছরের পর বছর উচ্ছেদ অভিযান, কয়েক দিনের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত থাকা, আবারও হকারদের ফিরে আসা- এভাবেই চলছে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত নিয়ে টানাপোড়েন।

হকারদের পুনর্বাসনে নতুন জায়গা প্রস্তুত করা হলেও সেখানে যেতে রাজি নন তাঁরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বারবার উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের এই চক্র থেকে বের হওয়ার স্থায়ী সমাধান কোথায়?

নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়কসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত দখল করে বসেন হকাররা। এতে পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। যানজটের পাশাপাশি বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ। এ পরিস্থিতি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থাকাকালে চাষাঢ়ায় হকারদের জন্য পৌর হকার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। সেখানে ছয় শতাধিক হকারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। তবে পরে তাঁদের অনেকে দোকান বিক্রি করে আবার ফুটপাতে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু সড়ক হকারমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেন। ওই বছরের ১৬ জানুয়ারি হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আইভী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ওই ঘটনায় হকারদের পক্ষ নিয়ে তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ ওঠে।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে হকার উচ্ছেদ নিয়ে কার্যকর ও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাঁদের ভাষ্য, পুলিশ বা সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা অভিযান চালালে হকাররা পাশের গলিতে সরে যান। অভিযান শেষ হলে আবারও ফুটপাত ও সড়কে বসেন। ফলে হকারমুক্ত ফুটপাতের উদ্যোগ বারবার নেওয়া হলেও তা টেকসই হয়নি।

নতুন জায়গা প্রস্তুত, যেতে নারাজ হকাররা

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর শহরের যানজট নিরসন ও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। পরে হকার উচ্ছেদে যৌথ অভিযানও চালানো হয়।

অভিযানের পর কয়েক দিন ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে আবারও হকাররা ফিরে আসেন। এ অবস্থায় তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য শহরের মূল সড়কের পাশে রেললাইনের খালি জায়গা নির্ধারণ করে সিটি করপোরেশন। সেখানে ইট বিছিয়ে বসার জায়গাও প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু হকাররা ওই জায়গায় যেতে রাজি নন। তাঁদের দাবি, রেললাইনের পাশে দেওয়া জায়গাটি স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নয়।

ফলে একদিকে পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত জায়গা পড়ে আছে, অন্যদিকে শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হচ্ছে না। সাধারণ মানুষকে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

‘হকারদের শেল্টারে রাজনৈতিক নেতারা’

সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীদের অভিযোগ, হকারদের একটি অংশ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় অভিযান চালাতে গিয়ে তাঁরা বাধার মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেন এবং তাঁদের ফুটপাতে বসতে সহযোগিতা করেন।

গত ৪ মে চাষাঢ়ায় হকার উচ্ছেদ অভিযানের সময় সিটি করপোরেশনের দুই কর্মচারীকে মারধর এবং তাঁদের মুঠোফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হকারদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ রোববার রাতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, রোববার রাতে হঠাৎ সড়কে নেমে হকার উচ্ছেদে অংশ নেন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা। তাঁর নির্দেশে গ্রীনলেজ ব্যাংকের মোড়ে হকারদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আকস্মিক উচ্ছেদে ক্ষুব্ধ হয়ে হকাররা তাঁদের মালামাল সড়কে ফেলে প্রতিবাদ জানান। এ সময় প্রশাসক ও উচ্ছেদ কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের তর্কাতর্কি হয়। পরে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠলে পুলিশ গিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ ঘটনায় কয়েকজন হকারকে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার তদবিরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে পরে হকার প্রতিনিধিরা থানায়ও বৈঠক করেন।

স্থায়ী পুনর্বাসন চান হকাররা, অনড় সিটি প্রশাসক

জাতীয়তাবাদী হকার্স ইউনিয়ন দলের মহানগর শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রনি বলেন, “আমরা চাই এর একটি স্থায়ী সমাধান। আমরা আজও থানায় গিয়েছিলাম। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসব। তারা আমাদের রেললাইনে জায়গা করে দিয়েছে। কিন্তু সেটা তো পার্মানেন্ট না। পার্মানেন্ট একটা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা হলে হকাররা কোথাও যাবে না।”

অন্যদিকে, ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বলেন, “স্থায়ী সমাধানের জন্য হকারদের বসার ব্যবস্থা করেছি। তাদের রেললাইনে জায়গা করে দিয়েছি, কিন্তু যেতে না চাইলে তো কিছু করার নেই। পুরো শহরবাসীকে তো জিম্মি করা যাবে না। ওরা মানুষকে জিম্মি করে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে রাখে। গতকালও মব সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এগুলো মেনে নেব না। ব্যবসা যদি করতে হয়, যেখানে জায়গা করেছি সেখানে বসবে। অন্যথায় ফুটপাত বা সড়কে বসা যাবে না।”

হকারদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার অভিযোগ তুলে সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “এখানে পলিটিক্যাল ইস্যু আছে। হকারদের পেছনে রাজনৈতিক শেল্টার আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পতিত স্বৈরাচারের সঙ্গে আঁতাত করে থাকা লোকজনও এখন নারায়ণগঞ্জে এসে হকার সেজে ফুটপাত দখল করে আছে, এমন তথ্যও আছে আমাদের কাছে। তারা একটা পরিবেশ তৈরি করে ঝামেলা বাঁধাতে চায়। এ ছাড়া সরকারি দলের মধ্যেও কিছু লোক আছে, যারা হকারদের শেল্টার দেয়। অন্য দলের লোকও আছে ইন্ধন দেওয়ার মতো।”

স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে সিটি প্রশাসক বলেন, “ভালো কাজ করতে গেলে অনেক বাধাবিঘ্ন আসবেই। এসব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করেই কাজ করে যেতে হবে। আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফুটপাত ফাঁকা রাখব।”

সমাধান কি শুধু উচ্ছেদে?

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অভিযান চালিয়ে হকার সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকলেও তা হকারদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে কিংবা উচ্ছেদের পর নিয়মিত তদারকি না থাকলে ফুটপাত আবারও দখল হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কারণে নগরবাসীর চলাচলের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থায় হকারদের জন্য কার্যকর ও টেকসই পুনর্বাসন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত তদারকি এবং উচ্ছেদে বাধা দেওয়ার অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন নগরবাসী।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়