যুবদল নেতা রনির পরিচয়ে এম্পায়ার কটন ফ্যাক্টরিতে ৬ ঘণ্টা নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক পোশাক ব্যবসায়ীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তুলে নিয়ে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন ও সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির লোক পরিচয় দিয়ে তাঁর ভাগিনা রিফাত ও সহযোগীরা তাঁকে তুলে নিয়ে যান। পরে বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার রাইসান রোমানের মালিকানাধীন ‘এম্পায়ার কটন’ নামে একটি ফ্যাক্টরির অফিসে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
সাগর ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, মামলা করার পর থেকে অভিযুক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে অভিযুক্তদের পক্ষে প্রশাসনে তদবির এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোরও অভিযোগ করেন সাগর।
সাগর হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার বিকেল পৌনে চারটার দিকে ফতুল্লার ইসদাইরের অক্টো অফিস এলাকার নিঝুম সোসাইটির একটি গলি দিয়ে বন্ধু সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী সঙ্গে যাওয়ার সময় তাঁকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুকেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি প্রাইভেট কারে তুলে বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার এম্পায়ার কটন অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে লোহার বস্তু দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় তাঁকে।
সাগরের অভিযোগ, নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে ওই ফোন থেকেই দুবাইপ্রবাসী ভগ্নিপতি হিরু সিকদারকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হয়। এ সময় তাঁকে ছাড়ার বিনিময়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রাখার পর তিনি মুক্ত হন। পরে রাতেই নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
সাগর (৩২) ফতুল্লার দেওভোগ নূর মসজিদ এলাকার শরিফ হোসেনের ছেলে। তিনি পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিসিকের শাসনগাঁও এলাকার অরুণ হাওলাদারের ছেলে রাইসান রোমান (৩২), মো. আতিক ও মাসদাইরের আব্দুস সালামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।

সাগরের দাবি, তাঁকে তুলে নেওয়ার সময় অভিযুক্তদের সুইচযুক্ত ধারালো ছুরি ছিল। ওই ছুরি গলায় ঠেকিয়ে তাঁর জামার কলার ধরে টেনে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে রাইসান রোমানের একটি প্রাইভেট কারে তুলে নেওয়া হয়।
নিঝুম সোসাইটির একটি ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও এক যুবককে সাগরের গলায় ছুরি ঠেকিয়ে টেনে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ছুরি ঠেকিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তি আব্দুস সালাম। তার সঙ্গে ভিডিওতে রিফাতকেও দেখা যায়। তার কাছেও ধারালো অস্ত্র ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত রিফাত জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির ভাগিনা। তার বাড়ি মাসদাইরে। অন্যদিকে আব্দুস সালামও মশিউর রহমান রনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে পরিচিত।
সাগর বলেন, “আমাকে অপহরণ করে মুক্তিপণ চেয়ে ছয় ঘণ্টা একটি অফিসে নির্যাতন করা হয়। আমি এই ঘটনায় মামলা করায় আমাকে নানান জন ফোন দিয়ে হুমকি দিচ্ছেন। আমি মানসিকভাবেও এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। পুলিশ-প্রশাসনের কাছে আমি আমার এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তার দাবি জানাই।”
সাগর ও তাঁর পরিবারের আরও অভিযোগ, মামলা হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে। তাঁরা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত রাইসান রোমানের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। ওই নেতারা রোমানের পক্ষে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত আব্দুস সালাম নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও তাঁর বিরুদ্ধে মাসদাইর এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, বুধবার বিকেলে এম্পায়ার কটন ফ্যাক্টরিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ওই কারখানার জেনারেল ম্যানেজার পরিচয়ে রাসেল আহম্মেদ নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, সাগর ও তার দুলাভাইয়ের কাছ থেকে ব্যবসায়িক লেনদেন রয়েছে। ঘটনার দিন স্বেচ্ছায় এম্পায়ার কটনের গাড়িতে ওঠে বলে দাবি করেন।
“সাগর ও তার দুলাভাই আসাদুজ্জামান হিরুর এম্পায়ার কটন টাকা পাওনা। গত ১১ অক্টোবর খবর পাওয়া যায়, নিউ ইনডেক্স এক্সসরিজও তাদের কাছে টাকা পাওনা রয়েছে। পাওনা টাকা নিয়ে সমঝোতার বিষয়ে অক্টো অফিস এলাকায় নিঝুম হাউজিং সোসাইটিতে সাগর উপস্থিত হলে সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। খবর পেয়ে এম্পায়ার কটনের মালিক রাইসান রোমান ও আতিকুল ইসলামসহ কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে পাওনা টাকা চাইলে সাগর হোসেন তালবাহানা শুরু করেন। পরে সাগর হোসেন পাওনার হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় এম্পায়ার কটনের গাড়িতে উঠে এম্পায়ার কটন ফ্যাক্টরিতে আসেন,” দাবি করেন রাসেল।
যদিও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, সাগরকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাগরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহাবুব আলম বলেন, এ ঘটনায় সাগর হোসেন প্রথমে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। মামলার তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।





































