০৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:১১, ৭ অক্টোবর ২০২৬

বাস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিজয়

বাস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিজয়

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসভাড়া নিয়ে কয়েক দিনের আন্দোলনের পর সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৮ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৪ টাকা ভাড়া নির্ধারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভাড়া কমানো ও শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, একাধিক বৈঠক এবং সড়ক অবরোধের ঘোষণার পর প্রশাসন, বাস মালিক ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে এ সমঝোতা হয়।

বুধবার (৭ অক্টোবর) জেলা পরিষদ কার্যালয়ে প্রশাসন, বাস মালিক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের বৈঠকে এই ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে সোমবারের বৈঠকেও একই ভাড়ায় নীতিগত ঐকমত্য হয়েছিল। ফলে কয়েক মাস ধরে ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা এবং পরে ৬০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলা আন্দোলনের আপাতত অবসান হলো।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস মালিকদের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এবার শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের আন্দোলনের মুখে প্রশাসন ও বাস মালিকদের আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি বাস মালিকদের একতরফা ভাড়া নির্ধারণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিজয়।

তবে এ বিজয় নতুন কোনো ঘটনা নয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসভাড়া বাড়ানো, যাত্রীদের ক্ষোভ, আন্দোলন, প্রশাসনের বৈঠক এবং শেষ পর্যন্ত নতুন ভাড়া নির্ধারণের এই চক্র চলছে অন্তত দেড় দশক ধরে। পুরোনো নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে ভাড়ার অঙ্ক বদলেছে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বদলেছে, কিন্তু সমস্যার ধরন খুব একটা বদলায়নি।

২০১১: ২২ থেকে ৩১, আন্দোলনের পর ২৭

২০১১ সালের ১৮ জুন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসভাড়া ২২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩১ টাকা করা হয়। এর প্রতিবাদে স্থানীয় সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ আন্দোলনে নামে। সংগঠনটির আহ্বায়ক ছিলেন রফিউর রাব্বি।

ভাড়া কমানোর দাবিতে ২০ জুন হরতালও ডাকে ফোরাম। পরে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বিআরটিএ, বাস মালিক ও যাত্রী অধিকার ফোরামের সমন্বয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয় ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার। একই সময় দুই দফায় ভাড়া কমিয়ে ২৭ টাকা করা হয়।

তবে ছয় মাস না যেতেই ভাড়া আবার ৩০ টাকা করার অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের শেষ দিকে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম আবারও জেলা প্রশাসনের কাছে ভাড়া প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

২০২১: ৩৬ থেকে ৫০, আন্দোলনের পর ৪৫

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২১ সালের নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর আবারও ভাড়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ৩৬ টাকার ভাড়া এক লাফে ৫০ টাকা আদায় শুরু করে কয়েকটি পরিবহন।

এর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম। পরে ৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলা প্রশাসন ৫০ টাকা থেকে পাঁচ টাকা কমিয়ে ৪৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে।

২০২২: আবার বাড়ল, আবার আন্দোলন

২০২২ সালের আগস্টে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে আবার ভাড়া বাড়ানো হয়। বন্ধন ও উৎসব পরিবহনে ৪৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। হিমাচল পরিবহনে ৫৫ টাকা এবং শীতল এসি পরিবহনে ৮০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়ার তথ্যও তখন প্রকাশিত হয়।

এর প্রতিবাদে আবার আন্দোলনে নামে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম। ১০ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি নন-এসি বাসের ভাড়া ৫০ টাকার মধ্যে আনার দাবি জানান। পরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য কমিটি করা হয়। কমিটির পরিদর্শনের পর ৫৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

২০২৪: ৫৫ থেকে ৫০, হরতাল প্রত্যাহার

২০২৪ সালের শেষ দিকে আবারও ৫৫ টাকা বাসভাড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করে।

১৬ নভেম্বর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বাস মালিক ও যাত্রী অধিকার ফোরামের বৈঠকের পর নন-এসি বাসের ভাড়া ৫৫ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়। শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়। এরপর রফিউর রাব্বি হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

২০২৫: আবার ৫৫, আবার প্রতিবাদ

এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে আবার ৫০ টাকা থেকে ভাড়া বাড়িয়ে ৫৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। এর প্রতিবাদে গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পাঁচ টাকা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

একই সময়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মুখে প্রশাসন ও বাস মালিকপক্ষ আলোচনায় বসে। পরে ৫০ টাকা ভাড়া বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

২০২৬: পুরোনো সমস্যার নতুন সংস্করণ

চলতি বছরের মে মাসে আবার ৫০ টাকা থেকে ভাড়া ৫৫ টাকা করা হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই সেপ্টেম্বরে ৬০ টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এবার আন্দোলনের সামনে আসে ছাত্র সংগঠনগুলো।

সাধারণ যাত্রীদের জন্য ৫৫ টাকা ভাড়া এবং শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা যৌক্তিক বাসভাড়ার দাবিতে মশাল মিছিল করেন। এর আগে ৬ অক্টোবর সড়ক অবরোধের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছিল।

এর মধ্যেই প্রশাসন, বাস মালিক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। সোমবারের বৈঠকে সাধারণ যাত্রীর ভাড়া ৫৮ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৪ টাকা নির্ধারণে নীতিগত ঐকমত্য হয়। বুধবারের বৈঠকে একই ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।

দেড় দশকেও কেন একই চক্র?

২০১১ থেকে ২০২৬ এই ১৫ বছরের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে বাসভাড়া নিয়ে একটি পুনরাবৃত্ত চিত্র দেখা যায়। ভাড়া বাড়ে, যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়, আন্দোলন শুরু হয়, প্রশাসন বৈঠকে বসে এবং শেষ পর্যন্ত ভাড়া কমানো কিংবা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। কিছুদিন পর আবারও ভাড়া বাড়ে।

সংখ্যাগুলোও সেই ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য দেয়। ২০১১ সালে ২২ টাকা থেকে ৩১ টাকা, ২০২১ সালে ৩৬ টাকা থেকে ৫০ টাকা, ২০২২ সালে ৪৫ টাকা থেকে ৬০ টাকা, ২০২৪ সালে ৫৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা, ২০২৫ সালে আবার ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা এবং ২০২৬ সালে ৬০ টাকা ভাড়া নিয়ে নতুন করে আন্দোলন প্রতিবারই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে ভাড়া।

জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বাড়লে ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। আবার যাত্রীদের সামর্থ্য, রুটের প্রকৃত দূরত্ব ও পরিবহনসেবার মানও ভাড়া নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করে স্থায়ী ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে ভাড়া নির্ধারণ না হওয়ায় বারবার আন্দোলনের প্রয়োজন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবার শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর ৫৮ টাকা সাধারণ ভাড়া ও ৩৪ টাকা শিক্ষার্থী ভাড়া নির্ধারণে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে আপাতত সমাধান হলেও দেড় দশকের অভিজ্ঞতা আবারও একটি প্রশ্ন সামনে রাখছে পরবর্তী ভাড়া বৃদ্ধির আগে কি এবারই এমন একটি স্থায়ী ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি হবে, যাতে ভাড়া বাড়লেই আবার রাজপথে নামতে না হয় যাত্রীদের।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়