০২ নভেম্বর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯:০৫, ১ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৯:১৮, ১ নভেম্বর ২০২৬

রেড ক্রিসেন্ট নির্বাচনে

বিএনপি নেতাদের নিরঙ্কুশ বিজয়েও ছিল অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

বিএনপি নেতাদের নিরঙ্কুশ বিজয়েও ছিল অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জেলা ইউনিটের প্রথম নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বাধীন নবী-টিপু প্যানেল। কার্যনির্বাহী কমিটির পাঁচটি সদস্য পদসহ সেক্রেটারি পদেও জয় পেয়েছেন এ প্যানেলের প্রার্থীরা। ভাইস চেয়ারম্যান পদে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় উতরে যান এ প্যানেলের প্রার্থী। তবে নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জাল ভোট ও ভোটার তালিকায় অসংগতির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন প্রার্থী ও ভোটার।

গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর নারায়ণগঞ্জ শহরে রেড ক্রিসেন্টের জেলা ইউনিটের এ নির্বাচন নিয়ে বেশ আলোচনা ছিল।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির ৫১ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম সরাসরি ভোটের মাধ্যমে কার্যনির্বাহী কমিটি নির্বাচিত হলো। এর আগে গত আগস্টে তিন মাসের জন্য একটি এডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

ওই কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. নবী হোসেন, সদস্য সচিব ছিলেন অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু এবং সদস্য ছিলেন রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী। এবারের নির্বাচনেও তাঁরা নিজ নিজ পদে বিজয়ী হয়েছেন।

শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জেলা পরিষদ কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ভোটগ্রহণ চলে। মোট ৯৯৭ ভোটারের মধ্যে ভোট দেন ৩৩৮ জন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফল ঘোষণা করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান অধ্যাপক মো. মামুন মাহমুদ।

সেক্রেটারি পদে ১৮৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. রেজাউল করিম খান রেজা পেয়েছেন ১৫৪ ভোট।

কার্যনির্বাহী কমিটির পাঁচটি সদস্য পদেও জয় পেয়েছেন নবী-টিপু প্যানেলের প্রার্থীরা। এ পদে প্রত্যেক ভোটার পাঁচজন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সর্বোচ্চ ২৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। অন্য নির্বাচিত সদস্যরা হলেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবির (২৮১ ভোট), ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন (২১৮ ভোট) ও অ্যাডভোকেট মো. জাকির হোসেন (২৭৫ ভোট), ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী (২৬৩ ভোট)।

এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন জেলা এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিরব রায়হান। তিনি পেয়েছেন ১১০ ভোট। মো. হারুন অর রশীদ খান পেয়েছেন ৯১ ভোট এবং মোহাম্মদ নাজমুল হক পেয়েছেন ৮৭ ভোট।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন জেলা আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নবী হোসেন। অন্যদিকে, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. মামুন মাহমুদ পদাধিকার বলে রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি এ নির্বাচনের পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রে ভোটার ও প্রার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ভোট চান এবং একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। ভোট দিতে ও নির্বাচন দেখতে কেন্দ্রে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান ও এনডিএ চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীবসহ এ সংস্থার সদস্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

তবে দুপুরের দিকে বৃষ্টির পর ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ বদলে যায়। জেলা পরিষদ ভবনের ভেতরে প্রার্থীদের ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে দেখা যায়। এমনকি ভোটকেন্দ্রের ভেতরেও প্রার্থীদের প্রবেশ করে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ ওঠে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা মাইকে একাধিকবার ঘোষণা দিলেও প্রার্থীরা সরে যাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সময় এক প্রার্থী জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে ছয়জনকে আটক করার দাবি করেন। তবে পরে তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভোট দিতে এসে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন জাসাস কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনিসুল ইসলাম সানি। তিনি বলেন, নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল। ভোটার তালিকায় সমস্যা ছিল এবং ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা রয়েছে। অযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অধীনে ভোট দিতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফল ঘোষণার আগে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন সেক্রেটারি পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম খান রেজা। তাঁর অভিযোগ, ভোট দেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাইয়ের দাবি জানানো হলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এনআইডি ছাড়াই কয়েকজনকে ব্যালট দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ভোটার তালিকার একাধিক সংস্করণ থাকায় অনেকে কেন্দ্রে এসে নিজেদের নাম ও ক্রমিক নম্বর খুঁজে পাননি। কারও নাম তালিকায় থাকলেও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যে অসংগতি ছিল। আবার কয়েকজন ভোটার কেন্দ্রে এসে জানতে পারেন, তাঁদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে।

রেজাউল করিম খানের ভাষ্য, বৃষ্টির আগ পর্যন্ত ভোটগ্রহণ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বৃষ্টির পর অনিয়ম বেড়ে যায়। জাল ভোট দিতে আসা দুই-তিনজনকে শনাক্ত করে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচজনকে কেন্দ্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ করেন তরুণ সদস্য পদপ্রার্থী ও জেলা এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিরব রায়হানও। তিনি বলেন, সকালে ভোটকেন্দ্রে সুন্দর ও আনন্দমুখর পরিবেশ ছিল। তবে শুরুতে কেন্দ্রের ভেতরে প্রার্থীদের লোকজনের অবস্থান ও ভোট চাওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও পরে তা শিথিল করা হয়।

নিরব রায়হানের অভিযোগ, একপর্যায়ে প্রার্থীদের লোকজন ভোট দেওয়ার বুথ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পান। বৃষ্টির পর ভোটগ্রহণের বুথগুলো ভেতরে নেওয়া হলে তাঁর এজেন্টরা প্রায় ১৫ জনকে ভুয়া ভোটার হিসেবে শনাক্ত করে বের করে দেন। কয়েকজন ভোটার নিজেদের বাবার নাম বলতে পারেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, তাঁর এক ভোটার চাকরি থেকে দ্রুত কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে গেলে জানতে পারেন, তাঁর ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত দুটি এক্স-স্ট্যান্ড ভেঙে ফেলা হয় এবং ব্যানার ছিঁড়ে দেওয়া হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান অধ্যাপক মো. মামুন মাহমুদ। তিনি বলেন, সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

মামুন মাহমুদ আরও বলেন, ৫১ বছরের ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির এটি প্রথম নির্বাচন। ঐতিহাসিক বিবেচনায় দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। নির্বাচিত ব্যক্তিরা সমাজসেবায় ভূমিকা রাখবেন। আর যারা নির্বাচিত হতে পারেননি, তাঁরাও আজীবন সদস্য হিসেবে নির্বাচিতদের সঙ্গে মিলেমিশে জনসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন অধ্যাপক বদরুননাহার, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সামছুন নূর বাঁধন, ব্যবসায়ী নেতা মো. সোহেল আক্তার সোহান এবং জেলা বিএনপির সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুল।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়