১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:৪২, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রূপগঞ্জে ভাড়াবাসায় সাঁওতাল কিশোরীর লাশ, পরিবারের দাবি ‘হত্যা’

রূপগঞ্জে ভাড়াবাসায় সাঁওতাল কিশোরীর লাশ, পরিবারের দাবি ‘হত্যা’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গত ৭ সেপ্টেম্বর ১৪ বছর বয়সী সাঁওতাল কিশোরী রিয়া সরেনের মরদেহ উদ্ধারের পর অপমৃত্যুর মামলা করেছিল পুলিশ। তবে ঘটনার কয়েকদিন পর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, রিয়া আত্মহত্যা করেনি; তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা নিতে পুলিশের কাছে আবেদন করা হলেও তা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন রিয়ার নানা বাবুরাম মুরমু। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি উঠে এলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রিয়া সরেনের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়। পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে মা রিবিকা মুরমুর সঙ্গে রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালী গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় ওঠে রিয়া। প্রায় দুই মাস আগে তার মা দিনাজপুরে ফিরে গেলেও রিয়া ওই বাসায় থেকে যান। বাসার কাছেই একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানায় অস্থায়ীভাবে কাজ করতেন তিনি। একই কারখানায় তার মাও কাজ করেছেন।

রিয়ার নানা বাবুরাম মুরমু বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে বাড়িওয়ালী তানিয়া তাদের ফোন করে জানান, ‘রিয়া স্ট্রোক করেছে’। খবর পেয়ে টাকা জোগাড় করে তারা দিনাজপুর থেকে রূপগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। পরদিন সকালে রূপগঞ্জে পৌঁছে থানায় গেলে তারা জানতে পারেন, রিয়া গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

ওইদিন ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের সদস্যরা রিয়ার মরদেহ নিয়ে দিনাজপুরে ফিরে যান এবং দাফন সম্পন্ন করেন। পরে বাড়িওয়ালীর ‘স্ট্রোক’ এবং পুলিশের ‘আত্মহত্যা’ বলার বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) তারা আবার রূপগঞ্জ থানায় এসে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে মামলা করতে চান। এ ঘটনায় বাড়িওয়ালী তানিয়া ও তার স্বামী জুয়েলকে সন্দেহ করছেন বলে জানান তারা।

বাবুরাম বলেন, “মৃত্যুর আগের রাতেও আমাগো লগে ফোনে কথা হইছে। এমন কিছু তো ঘটে নাই যে, সে ফাঁস দিবো। উল্টো বাড়িওয়ালী তারে বিদেশ পাঠাইবো নাকি কইছে, ওই জন্য পাসপোর্টও করতে দিছে কইছিল। কিন্তু পরদিনই শুনি সে মারা গেছে।”

তবে বাড়িওয়ালী তানিয়া পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে শুরুতে ‘আত্মহত্যা’ না বলে ‘স্ট্রোক’ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা আসতে দেরি করায় তিনিই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ডাকেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তানিয়া বলেন, “দুই বছর ধরে তারা এইখানে থাকে। মা আরেকজনকে বিয়ে করে চলে যাওয়ার পরও মেয়েটারে আমি নিজের মেয়ের মতো করে দেখছি। রিয়ার কোনো আত্মীয় নাকি তারে বিদেশে পাঠাইবো বলছিল। আমি ওই বিষয়ে কিছু জানি না। আর রিয়ার এক বান্ধবী তারে খুঁজে আইসা প্রথমে লাশ ঝুলতে দেখে।”

তানিয়া নিজেও ওই কারখানায় চাকরি করেন এবং রিয়াকে সেখানে চাকরি নিতে সহযোগিতা করেছিলেন বলে জানান।

রিয়ার পরিবারের সঙ্গে দিনাজপুর থেকে রূপগঞ্জে আসা ‘আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ এর সভাপতি মিকায়েল টুডু বলেন, “রিয়ার গলায় কালো দাগ ও কানের ওইদিকেও রক্ত ছিল। মূলত মৃত্যুর বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পরিবারটির মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। কিন্তু তারা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ হত্যা মামলা নিচ্ছে না।”

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে রিয়ার সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাহিদ মাসুম। তবে পরিবারের সদস্যরা রিয়ার বয়স ১৪ বছর জানালেও সুরতহাল প্রতিবেদনে তার বয়স ২০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

এসআই নাহিদ মাসুম বলেন, “প্রাথমিক আলামত অনুযায়ী বিষয়টি আত্মহত্যা বলে বিবেচিত হওয়ায় তখন অপমৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়। যদিও আত্মহত্যার পেছনের কারণ পরিষ্কার নয়। পাশেই তার খালা বিউটি মুরমু থাকতেন। তিনিই বাদী হয়েছেন এবং তারা না চাইলেও ভবিষ্যৎ তদন্তের জন্য আমরা লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠাই।”

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, “ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষা করতে হবে। ওই প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ উঠে আসবে। যদি বিষয়টি হত্যাকাণ্ড বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”


 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়