১১ অক্টোবর ২০২৬

শাহরিয়া প্রধান (ইমন)

প্রকাশিত: ২১:৩৭, ১১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২১:৩৯, ১১ অক্টোবর ২০২৬

বেচাকেনা ভালো, তবু লোকসানে কাইকারটেকের বাঁশ ব্যবসায়ীরা

বেচাকেনা ভালো, তবু লোকসানে কাইকারটেকের বাঁশ ব্যবসায়ীরা

হাটে বাঁশের বেচাকেনা চলছে, ক্রেতাও আসছেন নিয়মিত। সপ্তাহের একটি দিন নয়, বছরের পর বছর সপ্তাহজুড়েই চলে এই ব্যবসা। বাঁশ বিক্রির আয়েই কেউ গড়েছেন পাকা বাড়ি, বিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের। আবার কারও সংসার চলছে বাপ-দাদার রেখে যাওয়া পেশায়। অথচ সেই ব্যবসায় এখন আর আগের মতো লাভ নেই। জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেচাকেনা ভালো থাকার পরও লোকসান গুনছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী কাইকারটেক হাটের বাঁশ ব্যবসায়ীরা।

রোববার (১১ অক্টোবর) কাইকারটেকের সাপ্তাহিক হাট ঘুরে দেখা যায়, বাঁশের বেচাকেনা চলছে পুরোদমে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ কিনতে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বেচাকেনার এই চিত্রের আড়ালে রয়েছে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ার বাস্তবতা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের মতো দূরদূরান্ত থেকে বাঁশ আসে না। আর যা আসে, তা কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।

মোগরাপাড়ার সোনা মিয়া প্রায় ৪০ বছর ধরে বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই ব্যবসা করেই পাকা বাড়ি করেছেন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এক ছেলে বর্তমানে অনার্সে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ব্যবসা করে সংসার সামলালেও এখন লাভের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

সোনা মিয়া বলেন, ‘এখনো আমাদের বেচাকেনা ভালো। সারা সপ্তাহই ব্যবসা চলে। কিন্তু আগের মতো দূরদূরান্ত থেকে বাঁশ আসে না।’

একই সংকটের কথা জানালেন ৫৫ বছর বয়সী ওয়ালী উল্লাহ মিয়া। বাবা-দাদার আমল থেকেই তাঁদের পরিবার বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁর অধীনে কয়েকজন শ্রমিকও কাজ করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কাইকারটেক হাটের বাঁশ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।

ওয়ালী উল্লাহ মিয়া বলেন, ‘বেচাকেনা ঠিক আছে, কিন্তু বাঁশ আনা-নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। কোনোরকমে ডাল-ভাত খেয়ে ব্যবসাটা ধরে রেখেছি।’

ব্যবসায়ীদের এই সংকটের পেছনে রয়েছে বাঁশ পরিবহনের পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তনও। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীতে ভাসিয়ে বাঁশ আনা হতো কাইকারটেক হাটে। এখন সেই ব্যবস্থা প্রায় হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বেশির ভাগ বাঁশ আসে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। দূরপাল্লার পরিবহনে জ্বালানি তেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী ট্রলারে বাঁশ আনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে সরবরাহ কমছে, বাড়ছে ক্রয়মূল্য।

সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাফরদি এলাকার খোকন মিয়া জানান, তাঁর পরিবারের সবাই কোনো না কোনোভাবে বাঁশের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ কিনে কাইকারটেক হাটে বিক্রি করেন তাঁরা। এখান থেকে বাঁশ কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নির্মাণকাজসহ নানা প্রয়োজনে নিয়ে যান।

খোকন মিয়া বলেন, ‘আগে দেশের অনেক অঞ্চল থেকে নদীতে ভাসিয়ে বাঁশ আনা হতো। এখন সেই দিন নেই। বেশির ভাগ বাঁশ ময়মনসিংহ থেকে আসে। তেলের দাম বাড়ায় ট্রলারের ব্যবসায়ীরা এত দূর থেকে বাঁশ আনতে চান না। তাই মালও কম আসে। আবার এলেও বেশি দামে কিনতে হয়।’

কাইকারটেক হাটে বাঁশের বেচাকেনা এখনো থেমে নেই। তবে ব্যবসায়ীদের কাছে বেচাকেনা আর লাভ এক বিষয় নয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বিক্রির পর হাতে থাকছে কম টাকা, কখনো গুনতে হচ্ছে লোকসানও।

তবু বাপ-দাদার পেশা, পরিবারের জীবিকা আর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ধরে রাখতে হাট ছাড়তে পারছেন না তাঁরা। শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশের হাটে তাই এখন ব্যবসায়ীদের বড় দুশ্চিন্তা—বেচাকেনা ভালো থাকলেও বাড়তি খরচের চাপ সামলে আর কত দিন টিকে থাকা সম্ভব?

সর্বশেষ

জনপ্রিয়