আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শিশুরা, ৩ মাসে গ্রেপ্তার ১৫
নারায়ণগঞ্জে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। গত তিন মাসে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দরে দলটির মিছিল কিংবা মিছিলের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫ শিশু গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। তবে কোনো কোনো ঘটনায় শিশুদের বয়স বাড়িয়ে ১৮ বছর বা তার বেশি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে গ্রেপ্তার শিশুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলের প্রস্তুতির সময় অভিযান চালানো হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ১০ জনের মধ্যে পাঁচজনই শিশু। তাদের বয়স ১২, ১৪, ১৪, ১৫ ও ১৬ বছর। এ ঘটনায় ৪৫ জনের নাম উল্লেখ করে বন্দর থানায় মামলা হয়েছে।
এর আগে ২৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক ইউলুপ এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের মিছিলকে কেন্দ্র করে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ছয়জনের বয়স ছিল ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়।
এরপর ২৯ আগস্ট ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিলের প্রস্তুতির সময় ১০ কিশোর-তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজন থানা হাজতে রাজনৈতিক স্লোগান দিলে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এ হিসাবে তিন মাসেরও কম সময়ে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের তিনটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫ শিশু গ্রেপ্তার হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, এসব শিশু-কিশোরের সবাই রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারও জানে না তাদের সন্তান রাজনৈতিক মিছিল বা কর্মসূচিতে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, পাড়া-মহল্লার বন্ধু কিংবা পরিচিত ‘বড় ভাইদের’ সঙ্গে গিয়ে অনেকে এসব কর্মসূচিতে জড়িয়ে পড়ছে। আবার কোথাও আর্থিক সুবিধা বা অন্য কোনো সুযোগ পাওয়ার আশায় কিশোরদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে আগে থেকেই সম্পৃক্ত কিছু কিশোরও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাচ্ছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। পাড়া-মহল্লায় যাদের তারা ‘বড় ভাই’ হিসেবে অনুসরণ করে, তাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। বিদেশে অবস্থানরত বা পলাতক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারীদের নির্দেশেও কোনো কোনো কিশোর মিছিল ও ঝটিকা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়ে মামলা ও আদালতের মুখোমুখি হওয়া শিশুদের শিক্ষাজীবন ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অল্প বয়সে অপরাধ ও সংঘাতকেন্দ্রিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিন মাসের ব্যবধানে একই রাজনৈতিক দল ও এর সহযোগী সংগঠনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫ শিশু গ্রেপ্তারের ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শিশু-কিশোররা কীভাবে এসব কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে এবং তাদের সম্পৃক্ততা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বন্ধু, এলাকার ‘বড় ভাই’ কিংবা আর্থিক সুবিধার আশায় শিশুদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে এর পরিণতি শুধু গ্রেপ্তার বা মামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রভাব পড়তে পারে তাদের শিক্ষা, পরিবার, সামাজিক জীবন ও ভবিষ্যতের ওপর। নিরাপদ জীবন ও ভবিষ্যতের জন্য শিশুদের বিপদজনক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার দাবি উঠেছে সচেতন মহল থেকে।





































