বাড়ছে বিএনপির ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠন, অপরাধীরা কমিটিতে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ১১টি অঙ্গসংগঠন ছাড়া অনুমোদিত আর কোনো সহযোগী সংগঠন নেই। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে একাধিক সংগঠনের সঙ্গে ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘দল’- এ দু’টি শব্দ ব্যবহার করে প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন ভূঁইফোড় সংগঠন। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানে নামেও বেশকিছু সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
এসব সংগঠনের নামে গঠিত কমিটিতে এমনও লোকজন নেতা বনে যাচ্ছেন যারা নানা অপরাধী কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্ত। কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে একাধিবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
এদিকে, বিএনপির নেতারা বলছেন, মূল দলের বাইরে অনুমোদিত মাত্র ১০টি সহযোগী সংগঠন রয়েছে বিএনপির। এর বাইরে বেশকিছু ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠন গড়ে ওঠার খবর তারাও পাচ্ছেন। এসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে যাবারও ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে ‘তারেক জিয়া পরিষদ’ এবং ‘নারায়ণগঞ্জ জাতীয়তাবাদী সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকার চালক দল’ নামে দু’টি সংগঠন সক্রিয় হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা অনেকেই বিভিন্ন কারণে সমালোচিত ও বিতর্কিত। কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও রয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘তারেক জিয়া পরিষদ’ নামে সক্রিয় হওয়া সংগঠনটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন ফতুল্লার কাশীপুরের আলোচিত জোড়া হত্যা মামলার আসামি সাব্বির আহমেদ শহীদ। পদ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও দেখা গেছে শহীদের অনুসারীদের।
অথচ বিএনপির পক্ষ থেকে আগে থেকেই তারেক রহমান, তাঁর প্রয়াত মা খালেদা জিয়া কিংবা বাবা জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করে কোনো সংগঠন গঠন বা প্রচার-প্রচারণা না চালানোর বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
তবে কারা এসব ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠনের কমিটির অনুমোদন দিচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশে এমন কয়েকটি ‘ভূঁইফোড়’ সংগঠনের অফিস রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে সেখান থেকে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটির পদ-পদবি দেওয়া হয়। আর কমিটি নিয়ে বিতর্কিত লোকজন নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয়কেই ওইসব সংগঠনের জেলা কিংবা মহানগর কার্যালয় বানিয়ে ফেলেন।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলা সিএনজি অটোরিকশা প্রাইভেটকার চালক দল নামেও বিএনপির কোনো অঙ্গসংগঠন নেই। তবে সংগঠনটি ইতোমধ্যে থানা পর্যায়ে কমিটি গঠন করেছে। প্রায় এক মাস আগে বন্দর থানা কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি করা হয়েছে মো. রাসেল নামে এক ব্যক্তিকে, যিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’, ‘তারেক জিয়া স্মৃতি সংসদ’, ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মদল’ ও ‘হকার্স শ্রমিক দল’-সহ একাধিক অনুমোদনহীন সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগে তাদের মধ্যে কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
২০২৫ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদ সম্মেলন করে জানান, জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মুক্তিযুদ্ধা দল, কৃষকদল, মহিলা দল, ওলামা দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতীদল ও জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাস ব্যতীত বিএনপির আর কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নেই। তাই তারেক জিয়া পরিষদ কিংবা সিএনজি আটোরিকশা প্রাইভেটকার চালক দলসহ নারায়ণগঞ্জে যত সংগঠন রয়েছে তার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, “কারা কোথা থেকে এসব কমিটি দিচ্ছে, তা আমি জানি না। এগুলো দলের বদনাম করার জন্য করা হচ্ছে। যারা প্রকৃত অর্থে বিএনপি করেন, তাদের তো কোনো পদের প্রয়োজন হয় না। আমার মনে হয়, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে বিএনপির নামে এসব ভূঁইফোড় সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে।
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, “কোনো ভূঁইফোড় সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে কেন্দ্র থেকে অনেক আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা নিজেদের মতো করে সংগঠন বানিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা ব্যক্তিস্বার্থে করছে। নারায়ণগঞ্জে কেউ তারেক রহমান কিংবা বিএনপির নামে সংগঠন পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”





































