বদলে যাচ্ছে সিটি নির্বাচনের হিসেব-নিকেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজনের কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন সবসময় একটি আলোচিত নাম। এ সিটির নির্বাচনকে ঘিরে বিগত সময়ে নানা আলোচিত ঘটনা পেয়েছে দেশ। তবে, এবার এই নির্বাচনের হিসেব-নিকেশ বদলে দিবে কর্পোরেশনের সম্প্রসারিত সীমানা।
জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, সদর উপজেলার পুরো কুতুবপুর ইউনিয়ন যুক্ত হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে। এছাড়া, আরও তিনটি ইউনিয়ন ফতুল্লা, কাশীপুর ও এনায়েতনগরেরও বড় একটি অংশ যুক্ত হবে সিটিতে। অর্থ্যাৎ, বাড়ছে আয়তনে দেশের সবচেয়ে ছোট সিটি কর্পোরেশনটির সীমানা। একইসঙ্গে বাড়বে সিটির ভোটারও। ফলে, বিগত সময়ের তিনটি সিটি নির্বাচনের মতো এবারের সিটি নির্বাচনের হিসেব-নিকেশ পাল্টে যাচ্ছে।
বিশ্লেষক মহল বলছে, সিটি কর্পোরেশনের সীমানা বাড়া কেবল আয়তনে বৃদ্ধির ব্যাপার নয়, ভোটারের পাশাপাশি নতুন এলাকা সংযুক্ত হওয়াতে সেই এলাকার রাজনৈতিক আধিপত্য, সামাজিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতদিন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য সদর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জের তথা নারায়ণগঞ্জ মহানগরের রাজনীতির হাওয়ার খবর রাখাটাই ছিল জরুরি। এবার কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ যুক্ত হওয়াতে সেখানের স্থানীয় রাজনীতির একটি বড় অংশই মহানগরের বাইরে, ফলে নতুন এলাকা নতুনভাবে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মত অনেকের।
সিটি কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৬ সালে শীতলক্ষ্যা তীরের প্রায় ২৮ হাজার বাসিন্দার ৪ দশমিক ৫ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা। স্বাধীন বাংলাদেশে এ পৌরসভায় প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলী আহাম্মদ চুনকা। ২০০৩ সালে তাঁরই জ্যেষ্ঠ কন্যা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রথম নারী চেয়ারম্যান হন। ২০১১ সালে পাশের বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভাকে একত্র করে গঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। সাতাশটি ওয়ার্ড নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের মোট আয়তন ৭২ দশমিক ৪৩ বর্গকিলোমিটার। তবে আয়তনে ছোট হলেও এ সিটির ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি।
সিটি কর্পোরেশনের বিগত তিনটি নির্বাচনে বড় ব্যবধানে টানা জয় পেয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে, এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পর নিষিদ্ধ হয়ে আছে আওয়ামী লীগ। আইভী নিজেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হতাহতের ঘটনায় কয়েকটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এক বছরের বেশি সময় কারাভোগ করে এখন বাড়িতে আছেন। তার এইবার প্রার্থী হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে অনেক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইভীর অনুকূল পরিবেশ না থাকাতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কথা ছিল বিএনপির। কিন্তু সরকার গঠনের আগে ও পরে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ব্যক্তিস্বার্থে নানা দ্বন্দ্ব ও বিভাজন তাদেরকে সেই অবস্থানে রাখছে না। এরমধ্যে সীমানা সম্প্রসারণের বিষয়টিও মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়াতে পারে দলটির নেতাদের জন্য।
কারণ, সিটি কর্পোরেশনে যুক্ত হচ্ছে যে চারটি ইউনিয়ন সবক’টি নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসনের অধীভুক্ত এলাকায়। আর এই আসনে বিএনপির মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি গত সংসদ নির্বাচনে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অনুকূলে গিয়েছিল। আসনটিতে জয় পাবার পর এনসিপি তাদের রাজনৈতিক পরিসরও বাড়িয়েছে সেখানে। বিশেষ করে কুতুবপুরে দলটি কর্মী-সমর্থক বাড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইউনিয়নটিও কুতুবপুর। এ ইউনিয়নের বাসিন্দাও আড়াই লাখের বেশি। বাকি তিনটি ইউনিয়নেরও লাখখানেকের বেশি ভোটার যুক্ত হবে সিটিতে। ফলে সীমানা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবারের ভোটের হিসেব-নিকেশ বদলে দিবে।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন তথা- ফতুল্লার ওই চারটি ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীরও কর্মী-সমর্থক রয়েছে জেলার অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি। এক্ষেত্রে সীমানা বাড়ায় দলটির জন্যও খুব একটা খারাপ হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
তাছাড়া, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে বর্তমান প্রশাসক হিসেবে আছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি ২০১৬ সালের নির্বাচনে আইভীর বিপরীতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। সাখাওয়াত ছাড়াও আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে মহানগর বিএনপির আরো কয়েকজন নেতা আলোচনায় আছেন। তবে, তাদের অধিকাংশের রাজনীতি নারায়ণগঞ্জ মহানগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। সদর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় তাদের লক্ষণীয় মাত্রায় কর্মী-সমর্থক থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে তুলনামূলক কম জনপ্রিয় তারা। ফলে, সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবারের সিটি নির্বাচনের হিসেব বদলে দিবে।





































