০৪ জুলাই ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯:০৮, ৪ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১৯:১২, ৪ জুলাই ২০২৬

মেট্রোরেল: এমআরটি-২ প্রকল্পেই যুক্ত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ

মেট্রোরেল: এমআরটি-২ প্রকল্পেই যুক্ত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ

ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-২ প্রকল্প থেকে এক দফা বাদ পড়ার পর আবারও রাজধানীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে সরকার। সংশোধিত পরিকল্পনায় আগে বাদ দেওয়া নারায়ণগঞ্জ অংশ পুনর্বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

অর্থ্যাৎ, ঢাকার গাবতলী থেকে প্রস্তাবিত এই মেট্রোরেল পথটিতে নারায়ণগঞ্জ অংশের চারটি স্টেশন- ভূঁইগড়, জালকুড়ি, শিবু মার্কেট ও নারায়ণগঞ্জ সদর আবারও যুক্ত করা হচ্ছে। এতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় যেমন কমবে তেমনি এড়ানো যাবে যানজটও।

গত ৩১ মে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড এ প্রকল্পের অগ্রগতির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ শহরকে অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদনে দু’টি বিকল্প রুট যেমন: গাবতলী-ডেমরা এবং গাবতলী-ডেমরা-সাইনবোর্ড-ভূঁইগড়-জালকুড়ি-শিবুমার্কেট-নারায়ণগঞ্জ; বিবেচনা করার বিষয়ে মতামত প্রদান করা হয়েছে।

“ভৌত অবকাঠামো বিভাগের মতামত এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সুপারিশ অনুযায়ী এমআরটি লাইন-২ এর রুট অ্যালাইনমেন্টে নারায়ণগঞ্জকে অন্তর্ভুক্ত করে পুনরায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে,” বলেও জানানো হয় ওই প্রতিবেদনে।

ঢাকা মহানগর ও আশেপাশের এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে অত্যাধুনিক গণপরিবহন হিসেবে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনা করেছে ডিএমটিসিএল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ছয়টি মেট্রোরেল প্রকল্পের এমআরটি লাইন-২-এ ঢাকার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জকে সংযোগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ওই সময় সাইনবোর্ড হয়ে ভূঁইগড়, জালকুড়ি, শিবু মার্কেট ও নারায়ণগঞ্জ-এ চারটি স্টেশন করারও নকশা করা হয়। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজধানীর পাশের নারায়ণগঞ্জের চারটি স্টেশন বাদ দিয়ে এ প্রকল্প এগোয়।

ওই সময় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল বাকী মিয়া বলেন, “এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পের পরিকল্পনা রিভাইজ (সংশোধন) করা হয়েছে। ঢাকার গাবতলী থেকে এ লাইনটি ডেমরা হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড গিয়ে শেষ হবে।”

এ প্রকল্পে আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ভেতরে আরও তিনটি স্টেশন- ভূঁইগড়, জালকুড়ি ও নারায়ণগঞ্জ সেটশন- করার কথা থাকলেও সংশোধনী পরিকল্পনায় তা আর যুক্ত হচ্ছে না বলেও জানিয়েছিলেন আব্দুল বাকী মিয়া।

তিনি আরও বলেন, “শুরুর দিকে এমআরটি লাইন-৭ এর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। পরে যদিও এটি এমআরটি লাইন-২ এর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তবে, এখন নারায়ণগঞ্জ শহর মেট্রোরেল পথের সঙ্গে যুক্ত হবে এমআরটি লাইন-৭ এর মাধ্যমেই। কেননা, এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।”

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওই কর্মকর্তা এ কথা জানালেও গত মে মাসের ডিএমটিসিএল’র প্রতিবেদন বলছে, এই পরিকল্পনায় আবারও পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ভেতরে চারটি স্টেশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খরচ বাঁচাতে এমআরটি-২ প্রকল্প থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাদ দিলেও গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকারে আসা বিএনপি রাজধানীর পাশের শিল্পাঞ্চলকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ডিএমটিসিএল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ তাদের আপডেটিং অব দ্য রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের (ইউআরএসটিপি) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ম্যাক্সিমাম ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট সিনারিও-তে এমআরটি লাইন-২-এর অ্যালাইমেন্ট গাবতলী থেকে ডেমরা হয়ে তারাব বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রস্তাব করেছিল।

এ মেট্রোরেল পথের দৈর্ঘ্য হবে ২৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। যা নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করলে হওয়ার কথা ছিল ৩৪ কিলোমিটার।

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানায়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ অনুযায়ী এবং প্রস্তাবিত অ্যালাইমেন্টের উপর ভিত্তি করে এমআরটি লাইন-২-এর প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য গত বছরের ৮ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু গত ২৫ জানুয়ারি ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এমআরটি-২ প্রকল্প আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেয়। একইসঙ্গে জানানো হয়, নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প শুরু করার আগে ঢাকার সম্পূর্ণ মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা বা সময়সূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মেট্রোরেল পথে নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করতে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি’র এক সভায় এমআরটি লাইন-২ ও লাইন-৪ এ নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পর এমআরটি-২ মেইন লাইনটি গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর পর্যন্ত নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

ডিএমটিসিএলের প্রাথমিক হিসাবে, ৩৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই লাইন নির্মাণে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিগত সরকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) খসড়ায় রুটে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিলে নারায়ণগঞ্জ বাদ পড়ে।

বিএমটিসিএল’র এমন পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানায় নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক, নাগরিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো। এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পেই নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে মেট্রোরেলের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করার দাবি সংসদেও তুলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা মহলের দাবির কারণে এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পের পরিকল্পনায় আবারো পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা গেলে রাজধানীর ওপর চাপ কমার পাশাপাশি যাতায়াত সময় ও ব্যয় কমবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে পরিকল্পনার এই পরিবর্তন কত দ্রুত বাস্তবায়নে রূপ পাবে, তা নির্ভর করছে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থায়ন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর।
 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়