০৩ আগস্ট ২০২৬

লুবনা রহমান

প্রকাশিত: ২২:৩৯, ৩০ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ২২:৫৪, ৩০ মার্চ ২০২৬

সিন্ডিকেটের কবলে নদী, বিপন্ন নারায়ণগঞ্জ

সিন্ডিকেটের কবলে নদী, বিপন্ন নারায়ণগঞ্জ

ছোট্ট একটা শহর, যার পুরোটা জুড়েই অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতি। দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র হওয়ার পরও এখানকার জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন নেই। শহরের ধোঁয়া আর ধুলোয় মিশে আছে সাধারণ শ্রমিকের ঘাম, অথচ চারদিকে শুধু পয়সাওয়ালাদের দালান আর ঘিঞ্জি গলি। একটু যে বুক ভরে শ্বাস নেব, সেই অবস্থাও আজ আর নেই।

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল আমাদের এই নারায়ণগঞ্জ। এখানে বসবাসরত জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ সরাসরি এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ছোট্ট এই নগরীর অর্থনীতির চাকা ঘোরে এই মিল-ইন্ডাস্ট্রিগুলোর হাত ধরে। অথচ পরিতাপের বিষয় হলো, এই ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কোনো পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নেই; বরং পুরোটা জুড়েই অনিয়মের রাজত্ব। প্রভাব আর বিত্তের জোরে সব নিয়ম আজ মালিকপক্ষের পকেটে। আমরা ঢাকার অবস্থা দেখেছি—আজ ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও অবাসযোগ্য শহর। একটি শহর কেবল অপরিকল্পনা আর অনিয়মে কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এখন ঢাকা। আমাদের প্রাণপ্রিয় নারায়ণগঞ্জও সে পথে এগাচ্ছে।

শহরের কলকারখানাগুলোর বর্জ্য ফেলার কোনো নিয়ম-নীতির বালাই নেই। বুড়িগঙ্গার মতো আমাদের শীতলক্ষ্যা আর ধলেশ্বরীও আজ মরার পথে। বিষাক্ত কেমিক্যালে নদীর পানি এখন কুচকুচে কালো, যার তীব্র গন্ধে তীরের বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়াও দায়। মাছ তো দূরের কথা, এই পানি এখন সাধারণ ব্যবহারেরও অযোগ্য। আর এই অযোগ্যতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে নদীকে বিষাক্ত করে তুলে সাধারণ মানুষকে নদীবিমুখ করা হচ্ছে। আর জনগণের এই উদাসীনতাকে ব্যবহার করে চলছে নদী দখল। স্থানীয় প্রভাবশালীরা দেদারসে নদীর জায়গা নিজেদের নামে লিখে নিচ্ছে। তাদের পেছনে রয়েছে বড় বড় রাঘববোয়ালদের অদৃশ্য হাত, যারা প্রতিনিয়ত এই দখলদারদের অভয় দিয়ে যাচ্ছে। জনগণের সম্পদ—আমাদের এই নদীগুলোকে তারা আজ বাপ-দাদার সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছে।

কিছুদিন আগেই ধলেশ্বরী নদীতীরবর্তী গোপচর এলাকায় নদী দখলের কথা জানা যায়। রাতের আঁধারে এবং দিনের বেলায় প্রকাশ্যেই ড্রেজার দিয়ে বালু এনে নদী ভরাট করা হচ্ছে। মজনু নামে এক ব্যক্তি পৈত্রিক সম্পত্তির দাবি করে এই ভরাট কাজ চালাচ্ছে। মজনুর এ কাজে বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই। কারণ মজনুদের যে সিন্ডিকেট, তা শহরের উপরতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এমনকি প্রশাসনের লোকজনও এর সঙ্গে জড়িত। দিনের বেলা প্রকাশ্যে ড্রেজার দিয়ে যে কাজ চলছে, সে কাজ সম্পর্কে প্রশাসন অবগত নয়—এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বললে বলব, আপনারা বোকার স্বর্গে আছেন।

নদী ভরাটের এই সিন্ডিকেট নতুন কিছু নয়। আওয়ামী আমলেও কাটপট্টি এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ১০ হাজার বর্গফুট এলাকা ভরাট করা হয়, যেখানে সরকারদলীয় মেম্বার ও স্থানীয় নেতাদের জড়িত থাকার খবর পাওয়া যায়। একটি জরিপে দেখা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫টি প্রতিষ্ঠান ধলেশ্বরী নদীর প্রায় ৩৫ একর জায়গা দখল করে। এই দখলদারিত্বের পুরো সময় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, কারণ প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও ছিল আওয়ামী দালাল।

আমরা হাসিনা সরকারের এই লুটপাট থেকে বাঁচতেই ’২৪-এ আন্দোলন করেছিলাম, সংস্কারের জন্য নতুন সরকার গঠন করলাম। তারপরও এই সমস্ত অনিয়ম, দুর্নীতির সিন্ডিকেট উৎখাত করা গেল না। আগে এগুলো ছিল আওয়ামী লীগের পকেটে, এখন তা হাত বদল করে কার পকেটে গিয়ে ঢুকেছে, তা আপনারা সকলেই জানেন।

আগে ধলেশ্বরী নদীটি ছিল একটি জীবন্ত নদী, এখন তা শুধু নামমাত্রই টিকে আছে। আমাদের সবার সম্পদ এই নদী মুষ্টিমেয় লোক ভাগ-বাটোয়ারা করে খাচ্ছে। আমরা প্রায় প্রতিদিনই নদীপথে দুর্ঘটনার খবর পাই। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জে যারা নদীপথে যাতায়াত করেন, তারা এই দুর্দশার চিত্র আরও ভালো করে জানেন। দখলের কারণে নদীর প্রশস্ততা সংকুচিত হয়ে গেছে, ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরই পরিণতিতে নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে উঠেছে, যা মাছসহ নদীনির্ভর সকল প্রাণীর জন্য হুমকিস্বরূপ। আমার যেসব ভাইরা মাছ ধরে খেতেন, তাদের রুজি-রোজগার এখন প্রায় বন্ধ। আজ আমরা দেখি, শহরে একটু বৃষ্টি হলেই পানি আটকে থাকে; নদী ভরাট করে প্রায় সব সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পানি নামার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। আগে নদীপথে কম খরচে যাতায়াত ও পণ্য আনা-নেওয়া করা গেলেও এখন সেই সুযোগ নেই।

এই অঞ্চলের মানুষ চাই না আমাদের নদী মরে যাক। আমরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই—শুধু তালিকা তৈরি নয়, বরং দখলদারদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিন। বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসন, নদী রক্ষা কমিশন—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করে নদীর জমি উদ্ধার করুন। আর আমরা সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কোনো দখলদারি চোখে পড়লে প্রতিবাদ করতে হবে। ’২৪-এর চেতনার বিরোধী সমস্ত শক্তিকে রুখে দিতে হবে। সব ধরনের সিন্ডিকেটকে ধ্বংস করে আমাদের অধিকার নিজেদের বুঝে নিতে হবে।

কারণ নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব। নদী না থাকলে এই অঞ্চলের অস্তিত্বও বিপন্ন। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই নীরব বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠি। নদী দখলের প্রতিবাদে সোচ্চার হই।

লেখক: ‍লুবনা রহমান, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি, নারায়ণগঞ্জ জেলা
 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়