গার্মেন্টসে গ্যাস সংকট: নারায়ণগঞ্জের অর্ডার যাচ্ছে ভিয়েতনাম ও ভারতে
করোনা মহামারির ধাক্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পর এবার তীব্র গ্যাস সংকটে নতুন করে বিপাকে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় সময়মতো বিদেশে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ধীরে ধীরে ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সালের করোনা মহামারিতে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খায়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সরকার বিষয়টিতে উদ্যোগ নিলেও বন্ধ হওয়া অধিকাংশ কারখানা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
এরই মধ্যে সারাদেশে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, একের পর এক সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
মাসদাইর এলাকার ভোগ অ্যাক্সিস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের পরিচালক ফখরুদ্দিন আহমেদ বলেন, পোশাক উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াই এখন গ্যাস সংকটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিটিংয়ের পর কাপড় ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় যায়। কিন্তু গ্যাসের অভাবে ডাইং কারখানার কাজ সীমিত হয়ে পড়ায় পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, "গত কয়েক বছরে নানা সংকটের মধ্যেও কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি। এর মধ্যে অনেক ক্রেতা ভারত ও ভিয়েতনামে চলে গেছে। গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও পিছিয়ে পড়ব।"
প্রাইম গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান আবু জাফর বাবুল বলেন, আগে প্রতিদিন তার কারখানায় ৪০ হাজার পিস প্যান্ট উৎপাদন হতো। বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ২০ হাজার পিসেরও নিচে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, "সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেও উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করা যাচ্ছে না। হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওয়াশিং ও ডাইং কারখানায় কাপড় নষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময়মতো শিপমেন্ট দিতে পারছি না। অথচ গার্মেন্টস ব্যবসার প্রধান শর্তই হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ। এ অবস্থায় ক্রেতারা কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে।"
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পোশাক কারখানায় উৎপাদন ও শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, "উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কারণ উৎপাদন না হলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৮ তারিখের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে। আমরা সেই আশায় অপেক্ষা করছি।"
পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন আরও কমে যাবে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি আরও বাড়বে।





































