সিদ্ধিরগঞ্জের বিদ্যুৎ কেন্দ্র: ‘আসাদ সিন্ডিকেট’ ও তাদের অনিয়ম-দুর্নীতি
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন এ প্রতিষ্ঠানটিতে অন্তত দুই দশক ধরে চাকরিরত প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ। অসাধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে গড়ে তোলা এই সিন্ডিকেট সরকার-নিয়ন্ত্রিত এ প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘ বছর ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ‘আসাদ সিন্ডিকেটে’ প্রকৌশলী ফাতেমা নার্গিস, তাজুল ইসলাম অন্যতম। তাদের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে একদিকে প্রকল্পের অর্থ লোপাট হচ্ছে অন্যদিকে নিয়মিত তদারকি না থাকায় যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে সরকারি ব্যয় বাড়াচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসাদুজ্জামান আসাদ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছে। তিনি এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মেইনটেইন্যান্স বিভাগের প্রধানের দায়িত্বেও রয়েছেন। যদিও ২০০৫ সালে তিনি একজন সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী একই কর্মস্থলে সাধারণত তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালনের সুযোগ না থাকলেও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে টানা প্রায় ২০ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আসাদ। দীর্ঘ সময় একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ‘প্রেস নারায়ণগঞ্জ’ প্রতিষ্ঠানটিতে ‘আসাদ সিন্ডিকেট’র আরো কিছু অনিয়ম, দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, এ সময়ে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রকৌশলী একাধিকবার বদলি হয়ে নতুন কর্মস্থলে গেলেও তার বদলি হয়নি। বারবার বদলির আদেশ ঠেকিয়েও দিয়েছেন আসাদুজ্জামান। তার এই প্রভাবের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই তার ‘সিন্ডিকেটে’ ভিড়ে গেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী অভিযোগ করেন, প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান, প্রকৌশলী ফাতেমা নার্গিস মিলে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করিয়ে দরপত্র ও ব্যয় নির্ধারণ করে। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তবে, তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের মধ্যে একটি হলো, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির যন্ত্রপাতির কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের পর নিয়মিত ওভারহলিং করার প্রয়োজন থাকলেও এ সিন্ডিকেট তা করতো না। পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কার্যক্রম চালানোর কারণে এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা যেমন কমেছে, তেমনি বেড়েছে সরকারি খরচও। যদিও প্রতিষ্ঠানের মেইনটেইন্যান্স বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন আসাদুজ্জামান নিজেই।
নথিপত্র ও একাধিক সূত্র বলছে, ২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে সিদ্ধিরগঞ্জ থার্মাল পাওয়ার স্টেশন (তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র)। এই ইউনিটটি ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও গত কয়েক বছর ধরে সেখানে সর্বোচ্চ ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর পেছনেও রয়েছে ‘আসাদ সিন্ডিকেট’।
সূত্র বলছে, শুরুর দিকে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় সচল থাকলেও আসাদুজ্জামান সেখানে যোগদানের পর থেকে তা নেমে আসে ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াটে। আর এজন্য কারণ হিসেবে দেখানো হয় যান্ত্রিক ত্রুটি। কিন্তু এই যান্ত্রিক ত্রুটি কখনোই সমাধান হয়নি কেবল সিন্ডিকেটের দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা সরানোর একটি পথ খোলা রাখার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “১১১-১২০ মেগাওয়াট উৎপাদনে ইউনিটটির ব্যয় ছিল মাত্র ৪ টাকা ৫০ পয়সা, যা বেসরকারি বিদ্যুকেন্দ্রের তুলনায় অনেক কর্ম। সময়মতো ওভারহলিং করা হলে আবারও ২০০ থেকে ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হতো এবং এতে খরচ ২ টাকারও নিচে নেমে আসতো।”
কিন্তু নিয়মিত ওভারহলিং করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তা অবহেলা করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং রাশিয়ান একটি কোম্পানির মধ্যে ওভারহলিংয়ের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে ওভারহলিংয়ের কাজ শুরু করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তা শেষ হয়নি।
নথিপত্রে ওভারহলিং-এর কাজ ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হলেও তা বাস্তবে মাত্র ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্প কাজে ধীরগতি, তদারকির ঘাটতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়মের পেছনেও কাজ করেছে ওই ‘আসাদ সিন্ডিকেট’, অভিযোগ ওই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার।
সূত্র বলছে, ওভারহলিং-এর কাজ শুরুর সময় এ প্রতিষ্ঠানে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন কাজী জিয়াউল হক। তিনি পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। পরে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব পেলেও পরে তাকে ঢাকা বিউবো’তে প্রধান প্রকৌশলী করা হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে রদবদল হলেও আসাদুজ্জামান ও তার সিন্ডিকেটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো বদলি হয়নি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে বরং তাকে প্রতিষ্ঠানের ভেতর কোনঠাসা হয়ে যেতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাদেরই একাধিক সহকর্মী।
অন্তত ২০ বছর ধরে কর্মরত আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে একই ইউনিটে কর্মরত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের পাশাপাশি ওভারহলিং প্রকল্প ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মালামাল সরানো, মূল্যবান যন্ত্রাংশ অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া, এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
তার সিন্ডিকেটের অন্যতম- প্রকৌশলী ফাতিমা নারগিসও একইসঙ্গে একাধিক দপ্তরের দায়িত্বে রয়েছেন। সিভিল বিভাগে দায়িত্বে থাকার সময় তিনি ভবনের মেরামত কাজ সম্পূর্ণ না করেই ঠিকাদারের চূড়ান্ত বিল পরিশোধ এবং ঠিকাদারি কাজ নিজেদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কিনে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটে প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এবং নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সিদ্ধিরগঞ্জের ভূমি পল্লী এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সুযোগে আসাদুজ্জামান বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আওতাধীন বিউবো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটি ও পরিচালনা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা-বাড়ি বরাদ্দ-সংক্রান্ত দায়িত্বেও তিনি যুক্ত ছিলেন। নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে স্কুল ও মসজিদ কমিটি গঠন করেছেন, এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা বলেন, “গত ১০ বছরে অনেক কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন। কিন্তু আসাদুজ্জামান ও তার সিন্ডিকেটের লোকজনের বদলি হয়নি। বরং কয়েকবার নিজের বদলির আদেশ ঠেকিয়ে দিয়েছেন।”
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকায় তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে জানাচ্ছেন তার সহকর্মীরাই।
তবে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যোগাযোগ করা যায়নি অভিযুক্ত অপর তিন প্রকৌশলীর সঙ্গেও।
তবে, মুঠোফোনে সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মনির খান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”





































