ভিক্টোরিয়ার মর্গে ফ্রিজার অচল, লাশ রাখতে বাড়তি খরচ
জেলার একমাত্র মর্গটি রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে। কিন্তু এ মর্গে মরদেহ সংরক্ষণের তিনটি ফ্রিজারই ছয় মাসের বেশি সময় ধরে অচল। লাশ কাটার ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রটিও (এসি) নষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মর্গের প্রবেশপথে সামান্য বৃষ্টিতেই ময়লা পানি জমে থাকার সমস্যা।
ফলে ময়নাতদন্ত ও মরদেহ সংরক্ষণ করতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসক, কর্মচারী ও নিহতের স্বজনেরা। ফ্রিজার অচল থাকায় মরদেহ সংরক্ষণে কোনো কোনো পরিবারকে বাইরে থেকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে, গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ভেতরে অবস্থিত এ মর্গে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আনা মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। সম্প্রতি শহরের চাষাঢ়ায় মাদক-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের (৩২) মরদেহ সংরক্ষণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে তাঁর পরিবার।
পরিবারের দাবি, মর্গে মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব না হওয়ায় সেটি বাইরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখতে হয়। চার দিনে এ জন্য তাদের প্রায় ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
শুভর ভাই মো. ইব্রাহিম বলেন, “আমার ভাইয়ের লাশটাও ঠিকমতো রাখতে পারেনি। মর্গের মধ্যে পড়ে পচে যাচ্ছিল। পরে আমরা নিজেরাই ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখার ব্যবস্থা করি। পুলিশকে অনুরোধ করে দ্রুত ঢাকার হিমাগারে রাখা হয়।”
ফ্রিজার অচল, বাইরে বরফে মরদেহ রাখার অভিযোগ
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মর্গে প্রবেশের পথেই ময়লা পানি জমে আছে। সেই পানিতে সাঁতার কাটছে হাঁস। মর্গের ভেতরে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য থাকা তিনটি ফ্রিজারই অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মর্গের এক কর্মচারী বলেন, মর্গে মরদেহ এনে রাখা হলেও সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নেই। যেসব পরিবারের সামর্থ্য আছে, তারা বাইরে থেকে ফ্রিজিং গাড়ি ভাড়া করেন। আর নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ পচে যাওয়া ঠেকাতে বাইরে থেকে বরফ এনে কোনো রকমে ঢেকে রাখেন বলে জানান তিনি।
মর্গের দায়িত্বে থাকা ডোম দর্পন দাস বলেন, “এখানে অনেক মরদেহ আসে। তবে বেশির ভাগ মরদেহ এক-দুই দিনের বেশি রাখতে হয় না। কখনো অর্ধগলিত মরদেহ এলেও তা মর্গের ভেতরে রাখা হয়। ভালো অবস্থায় থাকা মরদেহ সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে লাশ রাখার গাড়ি ভাড়া করতে হয়।”
তবে এমন পরিস্থিতি খুব বেশি হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
মর্গের প্রবেশপথের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে দর্পন দাস বলেন, অল্প বৃষ্টি হলেই সেখানে ময়লা পানি জমে যায়। মর্গে যেতে রিকশা বা ভ্যানের প্রয়োজন হয়। অথচ এর পাশেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন। মর্গের সামনে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান তিনি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩২টি মরদেহ এ মর্গে আসে। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে এসব মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।
মর্গের ফ্রিজার প্রায় ছয় মাস ধরে নষ্ট বলে জানান নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. নাজমুল হোসেন বিপুল। এটি মেরামতের জন্য হাসপাতাল থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই এটি ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, দিনের বেলায় যেসব মরদেহ হাসপাতালে আসে, সেগুলোর ময়নাতদন্ত করে একই দিন প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। রাতে মরদেহ এলে সেদিন ময়নাতদন্ত করা সম্ভব না হলে পরদিন সকালে করার চেষ্টা করা হয়। আপাতত এভাবেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে।
ফ্রিজার নষ্ট থাকায় ময়নাতদন্তে সমস্যা হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সব সময় মৃত্যুর কত ঘণ্টা পর মরদেহ পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর পাঁচ বা ১০ দিন পর মরদেহ পাওয়া গেলেও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব।
আরএমও আরও বলেন, হাসপাতালে আসা মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য চিকিৎসকদের রোস্টার রয়েছে। সাধারণত যেদিন মরদেহ আসে, সেদিনই ময়নাতদন্ত করা হয়। সন্ধ্যার পর মরদেহ এলে পরদিন পরীক্ষা করা হয়। ফলে দুই-তিন দিন মরদেহ সংরক্ষণের প্রয়োজন হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধান করা হবে।





































