দুর্গাপূজার আমেজ নারায়ণগঞ্জে, প্রতিমায় শেষ তুলির টান
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠের ধারে কাশফুলের দোলা। কোথাও প্রতিমার চোখে শেষ তুলির টান, কোথাও চলছে অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ। অন্যদিকে, পূজার নতুন পোশাক কিনতে বিপণিবিতানগুলোতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। সব মিলিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
এ বছর নারায়ণগঞ্জ জেলার ২৪০টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হবে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। এবার দেবীর আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন নৌকায়।

সরেজমিনে নগরীর দেওভোগ এলাকার শত বছরের পুরোনো রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির এবং নিতাইগঞ্জের শ্রীশ্রী বলদেব জিউর আখড়া ও শিব মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমাশিল্পীদের ব্যস্ততা। মাটির কাঠামোয় গড়ে তোলা প্রতিমায় চলছে রং, অলংকার ও সাজসজ্জার শেষ কাজ। শিল্পীদের নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর চিরচেনা রূপ।

প্রতিমা তৈরির কারিগর মৃৎশিল্পী বিশ্বজিৎ বলেন, আগের তুলনায় এবার প্রতিমার চাহিদা কিছুটা কম হলেও ভালো অর্ডার পেয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রতিমাগুলো ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সে অনুযায়ী প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ।
এদিকে উৎসবের আনন্দ নির্বিঘ্ন রাখতে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। প্রতিটি মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারি অনুদান সুষ্ঠুভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ‘নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য জেলা প্রশাসন কাজ করছে। মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি স্থাপন, পূজার কার্যক্রম সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, আনসার, এসআরবি, বিজিবি ও গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ টহল ও মোবাইল টিম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু পূজামণ্ডপের সীমানায় সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে যাতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা না যায়, সেদিকেও নজরদারি থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, মণ্ডপের আশপাশে সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
শ্রীশ্রী বলদেব জিউর আখড়া ও শিব মন্দিরের সভাপতি জয় কে রায় চৌধুরী বলেন, ‘পূজার নিরাপত্তা নিয়ে এবার আমাদের কোনো শঙ্কা নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট। পূজার আয়োজনও ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ অটুট থাকবে বলে তাঁরা প্রত্যাশা করেন। সব ধর্মের মানুষ যেন সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারেন, উৎসবের দিনগুলোতেও সেই সৌহার্দ্য বজায় থাকুক।
এদিকে পূজার আগমনী আবহ ছড়িয়ে পড়েছে নগরীর বিপণিবিতানগুলোতেও। উৎসবের দিন নতুন পোশাক পরার আনন্দকে সামনে রেখে পরিবারের সদস্যদের জন্য পছন্দের পোশাক খুঁজছেন ক্রেতারা। শাড়ির দোকানে নারীদের আগ্রহ, পাঞ্জাবির সংগ্রহ ঘিরে পুরুষদের ব্যস্ততা এবং শিশুদের পোশাকের দোকানে রং ও নকশা বেছে নেওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

তবে কেনাকাটায় আগ্রহ থাকলেও পণ্যের বাড়তি দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে।
ক্রেতা সুজন সাহা বলেন, ‘প্রতিবছরই পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে পছন্দের জিনিস কেনার আগে হিসাব মেলাতে হচ্ছে। তবু বছরের বিশেষ এই উৎসবে নিজের জন্য এবং পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে সামর্থ্যের মধ্যে ভালো পোশাক কেনার চেষ্টা করছি।’
অন্যদিকে দোকানিরা বলছেন, এখনো পূজার বাজার পুরোপুরি জমে ওঠেনি। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ক্রেতাদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
পোশাক ব্যবসায়ী মো. জুয়েল হোসেন বলেন, ‘ক্রেতারা দোকানে এসে পছন্দের পোশাক দেখছেন, দরদাম করছেন। কিন্তু অনেকেই না কিনেই চলে যাচ্ছেন। আবার অনেকে কম দামের আশায় ফুটপাত থেকে পোশাক কিনছেন। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী বেচাকেনা এখনো হচ্ছে না।’
প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, মণ্ডপের সাজসজ্জা ও বিপণিবিতানগুলোতে কেনাকাটার মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জে ধীরে ধীরে জমে উঠছে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।





































