গোলাগুলি-মাদক-চাঁদাবাজিতে অস্থির নিতাইগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র নিতাইগঞ্জ এখন মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। এক সময় এই বাজারে প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। সিটি গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, আকিজগ্রুপসহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান চাল, চিনি, লবণ ও ভোজ্যতেলের ব্যবসায় বিনিয়োগের পর ঐতিহ্যবাহী নিতাইগঞ্জের ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। এদিকে, ২১০ বছরের পুরোনো এ বাজারে এখন মাদক কারবারি ও চাঁদাবাজদের অপতৎপরতা বাড়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরাজ করছে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক।
নিতাইগঞ্জের খালঘাট, ডালপট্টি ও মাছুয়া বাজারের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রাক স্ট্যান্ডে মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গত ২১ জুন দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় নিতাইগঞ্জ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাব্বির আহম্মেদ শহীদের অনুসারী চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা শুভর বিরুদ্ধে রাশেদ নামে এক পরিবহন মালিককে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে।
রাশেদ এক সময় মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। তবে হঠাৎ সে ট্রাক কিনলে তার উপর হামলার হয় বলে জানান স্থানীয়রা। এদিকে এ ঘটনার জেরে পরবর্তীতে নিতাইগঞ্জের কাছেই অবস্থিত ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে শুভর অনুসারীদের উপরও হামলা হয়। একই দিন ডালপট্টি এলাকায় শুভর পায়ে গুলি করে পাইকপাড়ার ঋষিপাড়া এলাকার মাদক ব্যবসায়ী আলম।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, নিতাইগঞ্জের বিভিন্ন মিল ও প্রতিষ্ঠানের সামনে প্রকাশ্যে গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিল বিক্রি করা হয়। ফলে স্থানীয় তরুণদের পাশাপাশি হাজারো শ্রমিকের কাছেও সহজেই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে। তবে এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারীরা জড়িত থাকায় অনেকেই প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দাবি, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হামলা, সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিতাইগঞ্জের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, কাশীপুর এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুন মামলার আসামি শহীদ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে। তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই এলাকার চিহ্নিত অপরাধীদের সবাই শহীদের অনুসারী বলেও জানান তিনি। শহীদের অনুসারী সন্ত্রাসীদের মধ্যে শুভ, শাহীন, আরাফাত, ইমরান, আকাশ আহমেদ পায়েলরা অন্যতম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সোনারগাঁয়ে নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারায়ণগঞ্জ শহরে ২০টি মাদকের স্পট থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, এর মধ্যে পাঁচটিরও বেশি স্পট নিতাইগঞ্জ এলাকায় রয়েছে।
মাদক ছাড়াও নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকদের অভিযোগ, নিতাইগঞ্জ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকলড়ী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাব্বির আহম্মেদ শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক বাপ্পী শিকদারের অনুসারীরা নিতাইগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্য ছাড়া পন্যবোঝাই ট্রাক থেকে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছেন। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা তুলতেন আজমেরী ওসমানের সহযোগী জাতীয় পার্টির ক্যাডার হাজী রিপন।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সাজেদুর রহমান ইসলাম বলেন, “হাসপাতালে মারামারির ঘটনায় কাশীপুরের এলাকার অনেকে জড়িত। এরা শহীদের অনুসারী বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে নিতাইগঞ্জে গুলি হয়েছে কিনা তা জানি না। আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। নিতাইগঞ্জে কারা কারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত সেটাও আমরা জানান চেষ্টা করছি।”
“তবে দীর্ঘদিন ধরে যেই অপরাধ চলছে তা মুহুর্তে সমাধান হয় না। পুলিশের একার পক্ষেও সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না। পুলিশ, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ সবাইকে একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে।”





































