প্রশাসন থেকে স্কুলকমিটি সবখানে বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকারে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকার গঠনের পর এ রাজনৈতিক দলের নেতারাই প্রশাসনিক বিভিন্ন পদ থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের স্কুল কমিটিগুলোর পরিচালনা পর্ষদের পদগুলোও বাগিয়ে নিয়েছেন। এমনকি পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনেরও দায়িত্বে রয়েছেন তারা। এরই মধ্যে নির্বাচন ছাড়াই একটি কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংসদে বসানো হয়েছে ছাত্রদলের নেতাদের। এজন্য প্রতিষ্ঠানের সভাপতি জেলা প্রশাসকের অবগতির প্রয়োজন হয়নি।
বিরোধী দলীয় রাজনীতিকদের অনেকে বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ক্ষমতার পালাবদলে হাট, মাঠ, ঘাটসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী খাতের দখলদার পাল্টে যেতে থাকে। এসব জায়গায় নতুন দখলদার হিসেবে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নাম একাধিকবার উঠে এসেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বসানো হচ্ছে বিএনপি নেতাদের।
এমন চর্চাকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পথের দিকে যাবার প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেছেন খোদ বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গত ১৯ জুন নারায়ণগঞ্জ নগরীর কেন্দ্রীয় ইদগাহ ময়দানে দলটির এক কর্মী সম্মেলনে বিরোধী দলীয় এই নেতা বলেন, বিএনপি বিভিন্ন জায়গায় তাদের দলীয় ক্যাডার ও নেতাদেরকে বসাচ্ছে। এইভাবে তারা একদলীয় শাসন কায়েম করার চেষ্টা করছে।
জামায়াত আমীর জেলা পরিষদের উদাহরণ টেনে বলেন, “এ ছাড়া জেলা পরিষদের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের দলীয় ‘ক্যাডার’ ও নেতাদেরকে প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইভাবে দলীয় শাসন, একদলীয় শাসন বাংলাদেশে কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
এর আগে গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এসব বিষয়টি গত কয়েকদিনে বেশি করে উঠে আসছে। দপ্তরগুলোতে দলীয় লোক না বসিয়ে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করার তাগিদও দিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার গঠনের কয়েকদিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। সাত খুন মামলার সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আলোচিত এই বিএনপি নেতা ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটির নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে তৎকালীন মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন। কিন্তু বিএনপি সরকারে আসার পরপরই তিনি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের চেয়ার পান।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হয়, নারায়ণগঞ্জ সিটির দায়িত্ব পেয়েছেন মহানগর বিএনপির ওই নেতা। অভিযোগ রয়েছে, সাখাওয়াত সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি নতুন নিয়োগ হয়েছে। সেসব নিয়োগেও জায়গা পেয়েছেন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলে থাকা নেতা-কর্মীরা। দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকে ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে সহায়তা কমিটি গঠনের চেষ্টা চালিয়ে সেখানে বিএনপি নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েন।
সাখাওয়াত হোসেন সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হওয়ার আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ পদটিতে সরকারি আমলাদেরই রেখেছিল। বিএনপি সরকার এসে আমলাদের সরিয়ে দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেয়।
এদিকে, সাখাওয়াত সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর গত মার্চে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। একইভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়।
এদিকে, চলতি মাসে জেলা বিএনপির আরেক নেতা মাশুকুল ইসলাম রাজীবকে বসানো হয়েছে নতুন গঠিত নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) চেয়ারম্যান পদে। জেলা বিএনপির এ যুগ্ম আহ্বায়ক এনডিএ’র প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। এর আগে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন না হওয়ায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে ছিল শিল্পঘন এ জেলাটি। সরকারি আমলারাই সাধারণ রাজউকের শীর্ষ পদগুলোতে থাকতেন। কিন্তু বিএনপি সেখানে বসিয়ে দলীয় নেতাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বিএনপি নেতারা
গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অধিকাংশ নেতা পালিয়ে যান, বাকিরা হন গ্রেপ্তার। ফলে, যেসব নেতারা বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বে ছিলেন সেসব পদ শূণ্য হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছর এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও বিএনপি সরকার আসার পর ম্যানেজিং কমিটির পদগুলোও বাগিয়ে নিয়েছেন বিএনপি নেতারা। অনেক জায়গায় বসানো হয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম নিজে পদাধিকারে শহরের দু’টি হাসপাতাল ও কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে থাকাটা স্বাভাবিক হলেও তার ছেলে, মেয়ে ও ছেলের স্ত্রীও পেয়েছেন তিনটি স্কুলের সভাপতির পদ। আবুল কালামের ছেলে আবুল কাউসার আশা, যিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি বর্তমানে বিনা নির্বাচনে শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
আবুল কাউসার আশার বোন অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধন হয়েছেন আরেক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি। তার ভাবী অর্থ্যাৎ আশার স্ত্রী ইফাত আরা হয়েছেন হাজী সিরাজউদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান বিএনপি সরকারের আমলেই হয়েছেন শহরের আমলাপাড়ায় অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি। এছাড়াও তিনি পাশের ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ আইন কলেজেরও উপদেষ্টা পদে আছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও অন্যান্য বিএনপি নেতাদের হস্তক্ষেপে আইন কলেজের একটি ছাত্র-ছাত্রী সংসদও গঠন করা হয়েছে। যেখানে কমিটির সহসভাপতি করা হয়েছে এক ছাত্রদল নেতাকে, অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন এক সময় ছাত্রলীগ করে পরে ছাত্রদলের রাজনীতিতে ঢোকা এক নেত্রীকে। বাকি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও জায়গা পেয়েছেন বিএনপির সঙ্গে রাজনীতি করা লোকজন।
এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির থাকলেও তাকে অবগত না করেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে গণমাধ্যমে দাবিও করেছিলেন তিনি। তিনি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন জানালেও পরে আর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
শহরের পাইকপাড়া এলাকায় আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতির পদে আছেন নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী নাঈম। দেওভোগের লক্ষ্মীনারায়ণ বালক-বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদে আছেন ১৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি দিদার খন্দকার।
কেবল সদরেই নয়, বন্দর, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলাতেও একইভাবে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন, স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন। যদিও শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগীদের মাধ্যমেই শিক্ষার মানোন্নয়নে এসব কমিটি হওয়ার কথা ছিল বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
এদিকে এসব নিয়োগ ও কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার পালাবদলে নতুনদের আসাটা স্বাভাবিক হলেও একক রাজনৈতিক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো সংবেদনশীল জায়গায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। তারা মনে করছেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠন না হলে ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা কমে যাবে এবং দলীয়করণের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, “আমি মনে করি, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। চব্বিশের পরে দেশটা একটু অন্যভাবে চলবে বলেই ভেবেছিলাম। আমাদের অন্তত আশা ছিল, বিগত সরকারের ধাঁচে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা আর এদেশে চলবে না। কিন্তু আমাদের নিরাশ করা হয়েছে।”
“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের চেষ্টা বেশি হতাশ করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের পাঠের মানোন্নয়নে শিক্ষাবিদ কিংবা শিক্ষানুরাগীদের কমিটিতে আনার কথা ছিল। কিন্তু সেখানেও দলীয় লোক, সাংসদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। সেই একই পুরোনো ধাঁচ। এই চর্চার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কথা বলছেন, কিন্তু তার দলের লোকজন ভিন্ন চর্চা করছে। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রীর কথা অন্তত বিবেচনা করে হলেও এই চর্চা বাদ দেওয়া উচিত।”
“দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ভালো কোনো লক্ষণ না, এই চর্চা ভালো কিছু বয়ে আনে না,” যোগ করেন সুজন সভাপতি।





































