শ্রমিক আন্দোলনে পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, ক্রয়াদেশ কমার আশঙ্কা
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টানা তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে পোশাকশিল্পে। আন্দোলনের কারণে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সফরও বাতিল হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্পমালিকেরা।
শিল্পমালিকদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাসসংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে।
আরএস কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, আন্দোলনের কারণে কারখানাভেদে ক্ষতির পরিমাণ আলাদা। তাৎক্ষণিকভাবে সব কারখানার ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর নিজের কারখানায় একদিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মতো উৎপাদন বন্ধ ছিল।
তিনি জানান, আন্দোলনের কারণে তাঁর কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকে কারখানায় আসেননি। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা পাওয়ায় তাঁরাও আসেননি।
মোর্শেদ সারোয়ার বলেন, কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানার নয়, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এমন পরিস্থিতি দেখলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে তাঁদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়। পরে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হয়। এতে ওভারটাইম বাবদ বাড়তি ব্যয় হয়। পাশাপাশি পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হলে ক্রেতারা মূল্যছাড় বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ বাতিলের আশঙ্কাও থাকে।
শ্রমিক আন্দোলন প্রসঙ্গে মোর্শেদ সারোয়ার বলেন, শ্রমিকেরা সাধারণত শান্তিপ্রিয়। তবে ভুল বোঝানো বা বিভ্রান্তির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। মালিকপক্ষ, প্রশাসন, পুলিশ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সমন্বিতভাবে কাজ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অন্যদিকে ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা যত বেশি হয়, সেই দেশে পণ্যের দাম তত কম দেওয়া হয়। ভালো ভ্যালু বা বেশি মুনাফার পণ্য দিতে চায় না। স্বল্পমেয়াদি ক্রয়াদেশ দিতে চায়। আমরা আস্তে আস্তে সেই জায়গা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।’
ফজলে শামীম এহসানের দাবি, গত আট মাসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের তুলনায় বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ কমেছে।
তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে গিয়ে পণ্য কেনার মতো করে ক্রয়াদেশের সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণ করেন। এ ধরনের ঘটনার পর তাঁরা বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ কৌশল ঠিক করবেন। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ কমতে পারে।’
এদিকে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, জেলায় প্রায় তিন হাজার পোশাক ও শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ফতুল্লার সাতটি কারখানাকে কেন্দ্র করে মূলত আন্দোলন হয়েছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবারের বিশৃঙ্খলার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও এক হাজার থেকে দেড় হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার সকালে মাইক্রোফাইবার, মেট্রো গার্মেন্টস ও ইউরোটেক্সসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
শ্রমিকেরা কর্মস্থল ত্যাগ করায় বুধবারের জন্য মেট্রো ও লিবার্টি কারখানা বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। তবে বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এর আগে গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি মজুরি বোর্ডে উত্থাপনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বলবে ৩০ হাজার না ৫০ হাজার টাকা বেতন লাগবে, সেখানে বলবে। রাজপথে তুমি ৩০ হাজার বললে কি ৩০ হাজার হয়ে যাবে? এটা তো হতে পারে না।’
আন্দোলন প্রসঙ্গে হাতেমের অভিযোগ, ‘এগুলো পরিকল্পিতভাবে এই সেক্টরটাকে অশান্ত করার জন্য, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য করা হচ্ছে।’
শিল্পমালিকেরা বলছেন, শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত দাবি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের মূল দাবি ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। তবে এ দাবির বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।





































