ই-বেলবন্ডে দ্রুত জামিন, বন্ধ হয়েছে ‘ম্যাল-প্র্যাকটিস’
জামিন পাওয়ার পর আসামির কারামুক্তিতে আগে যেখানে কয়েক দিন সময় লাগত, অনলাইনে জামিননামা (ই-বেলবন্ড) দাখিল পদ্ধতি চালুর পর সেই সময় কমে এসেছে। আদালত থেকে কারাগারে জামিননামা পৌঁছানো এবং কারামুক্তির প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হওয়ায় কমেছে সময় ও হয়রানি।
একই সঙ্গে জামিনের কাগজপত্র পৌঁছানোর মাঝপথে অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ ছিল, সেটিও বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর একটি উদাহরণ মো. সাইদুল ইসলাম। গত ১০ আগস্ট ফতুল্লা থানার একটি মাদক মামলায় নারায়ণগঞ্জের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পান তিনি। এর কয়েক দিন আগে নীলফামারী জেলা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে ওই জেলার কারাগারে বন্দি ছিলেন সাইদুল।
জামিন পাওয়ার দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার জামিননামা অনলাইনে দাখিল করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে জামিননামার তথ্য নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্ভারে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে তা পাঠানো হয় নীলফামারী জেলা কারাগারে। ১২ আগস্ট সকালে কারাগার থেকে মুক্তি পান সাইদুল।
তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লা বলেন, “৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এক জেলার আদালতে জামিন পাওয়া আসামি দূরবর্তী আরেক জেলার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন কেবল ই-বেলবন্ড সুবিধার কারণে। পুরোনো পদ্ধতিতে জামিননামার কাগজ পৌঁছাতে এবং কারাগার থেকে বের হতে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগত।”
বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে গত বছরের ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রথম অনলাইনে জামিননামা দাখিলের কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে ২৮টি জেলা এ কার্যক্রমের আওতায় এসেছে। ডিসেম্বর নাগাদ সবগুলো জেলাতেই এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা ভাবছে সরকার।
আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, ই-বেলবন্ড চালু হওয়ায় সময় ও শ্রমের অপচয় কমেছে। জামিনের পর আসামির কারামুক্তির তথ্য মুঠোফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমেও পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এ পদ্ধতিতে কিছু প্রযুক্তিগত জটিলতার কথাও জানিয়েছেন আইনজীবীরা। সার্ভারে প্রবেশে সমস্যা, সময়মতো ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) না আসা এবং তথ্যগত ভুলের কারণে কখনো কখনো কারামুক্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ূন কবির বলেন, সব আইনজীবী মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে সমান দক্ষ নন। বিশেষ করে প্রবীণ আইনজীবীদের কেউ কেউ ই-বেলবন্ড দাখিল করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন। অনেকে কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে ফরম পূরণ করায় অতিরিক্ত অর্থও দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিচারক বেলবন্ড অনুমোদন করে কারাগারে পাঠানোর পর মাঝপথে তথ্যগত কোনো ভুল ধরা পড়লে আবার সংশোধন করে পাঠাতে হয়। এতে জটিলতা তৈরি হয়।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি সঙ্গে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করা রুবেল মিয়া জানান, প্রায় তিন মাস আগে তথ্যগত জটিলতার কারণে এক আসামির কারামুক্তিতে দুই দিন অতিরিক্ত সময় লেগেছিল। বৃহস্পতিবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিন পাওয়া ওই ব্যক্তির এজাহারে থাকা নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের গড়মিল থাকায় জামিননামা ফেরত আসে। পরে সংশোধিত তথ্য পাঠানো হলেও সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি রোববার কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ই-বেলবন্ড চালুর আগে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া অ্যাডভোকেট আদনান মোল্লা বলেন, ওয়েবসাইটে ঢোকার লিংক অনেক সময় কাজ করে না। আবার সবসময় ওটিপির খুদেবার্তাও পাওয়া যায় না। ফলে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়।
তবে সামগ্রিকভাবে অনলাইন পদ্ধতি আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমিয়েছে বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম। তার মতে, পদ্ধতিটি আরও সহজ করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলো দূর করা প্রয়োজন।
ই-বেলবন্ডে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন আদালত ও কারা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোসা. মাহমুদা খাতুন বলেন, আগে আদালতের কর্মীদের হাতে করে জামিননামার কাগজ কারাগারে নিয়ে যেতে হতো। অনলাইনে কাজ হওয়ায় সময় ও শ্রম দুটোই কমেছে। বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিও কমেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের সুপার আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ই-বেলবন্ড বিচার বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এতে মানুষের ভোগান্তি কমেছে। তার মতে, জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পর্যন্ত মাঝপথে যে ‘ম্যাল-প্র্যাকটিস’ বা অনিয়মের সুযোগ ছিল, অনলাইন পদ্ধতিতে তা বন্ধ হয়েছে।





































