২৪ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:৩২, ২৩ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ২১:৫৫, ২৩ আগস্ট ২০২৬

‘বিএনপির কাউকে আঘাত করিনি’ শামীম ওসমানের দাবি ‘মিথ্যা ও স্টান্টবাজি’

‘বিএনপির কাউকে আঘাত করিনি’ শামীম ওসমানের দাবি ‘মিথ্যা ও স্টান্টবাজি’

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। ভারত থেকে দুবাই হয়ে বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ফেরারি আসামিও তিনি।

দেশ ছাড়ার পর সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৬ বছরে বিএনপির কাউকে আমরা বিন্দুমাত্র আঘাত করিনি। বরং এখন একজন এমপি হয়েছেন, ৩ আসন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একদিনের মধ্যে আমি তাকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিলাম। আরেকজনকে একটা গোয়েন্দা সংস্থা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, আমি সেখান থেকে তাকে ফেরত নিয়ে এসেছিলাম। আরেকজনকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যে ওসি করেছিল, তাকে আমি সেখান থেকে বদলি করেছিলাম। ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বর ভেঙে দেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে আমাদের বায়তুল আমান ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আগের দিন ঘোষণা দিয়ে এটা ভাঙা হয়েছে। যেই বিএনপি নেতারা এটা করলো, তারাও কিন্তু আমার কাছ থেকে উপহার নিয়েছে। আমি সেটা বলতে চাই না, আমার কাছে প্রমাণও আছে, রেকর্ডও আছে।"

শামীম ওসমানের এই বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতারা বলছেন, বাস্তবতা তার দাবির ঠিক উল্টো।

শামীম ওসমানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রেস নারায়ণগঞ্জকে তিনি বলেন, "আমার সঙ্গে শামীম ওসমানের জীবনে একদিনও কথা হয়নি। এখন সে বললে আমি কী করতে পারি।" 

পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনার দাবিও নাকচ করে মান্নান বলেন, তিনি কখনো সরাসরি গ্রেপ্তার হননি, বরং মামলা হলে আদালতের মাধ্যমেই জামিন নিয়েছেন। তার ভাষায়, "দূরে বসে তো অনেক কথাই বলা যায়। এগুলো আসলে মিথ্যা কথা।"

শামীম ওসমানের নির্দেশেই নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার ও সন্তানদের বিরুদ্ধে জেলার সব থানায় মামলা হয়। গিয়াসউদ্দিন বলেন, "ডিবি পুলিশ দিয়ে আমার বাড়িঘর ঘেরাও করে রাখত, আরও নানাভাবে নির্যাতন করত।" এমনকি স্ত্রীর মৃত্যুর পরও পরিস্থিতির কারণে জানাজায় অংশ নিতে পারেননি বলে জানান তিনি।

শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমাকে নিয়ে তার পুরনো বক্তব্য এবং বর্তমান বক্তব্য মূল্যায়ন করলেই তো সব বোঝা যাবে। তবে তাকে নিয়ে কথা বলে নিজেকে ছোট করতে চাই না। মানুষ নানানভাবে খ্যাতি পান, তিনি কীভাবে আলোচিত হয়েছেন সেটা সবার জানা আছে। তিনি বারবার দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে খুব গর্ব করে কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের জন্মও এই দেশে, মৃত্যুও এখানেই হবে।"

শামীম ওসমানকে দেশের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী আখ্যা দিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তিনি বলেন, "শামীম ওসমানের মতো মিথ্যাবাদী সারা দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে আমার নামে ৫০ টি এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৮ নভেম্বর ১ দিনে ১৩ টি মামলা কার নির্দেশে হয়েছে? তাদের হুকুমে একদিনে ৭ থানার মামলায় আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। " বিএনপির কাউকে ক্ষতি না করার দাবি নাকচ করে টিপু প্রশ্ন তোলেন, দলীয় নেতা গিয়াসউদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেনের নামে এত মামলা কার নির্দেশে হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি নেতা মশিউর রহমান রনিকে অল্প বয়সেই গুম করা হয় এবং তাকেও ক্রসফায়ারের নির্দেশ দিয়েছিলেন শামীম ওসমান, যার সত্যতা সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে নিজে জানিয়েছেন বলে দাবি করেন টিপু।

শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এখন সে বিদেশে বসে যা বলছে, এগুলো সব স্ট্যান্টবাজি। তিনি তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৪ সালে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছেন। ত্বকী, চঞ্চলকে কারা হত্যা করেছে? বায়তুল আমান জনতার রোষানলেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিনি বিএনপির কাকে সুবিধা দিয়েছেন, নাম বলুন।"

মহানগর বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল মজিদ বলেন, শামীম ওসমান কাকে কী সহযোগিতা করেছেন তা তার জানা নেই, তবে তাকে এবং তার ভাই মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাসান আহমেদকে তিনি অনেক ক্ষতি করেছেন। তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ শহর, বাবুরাইল ও শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকা ফতুল্লায় তাদের একটা প্রভাব থাকার কারণেই তারা শামীম ওসমানের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কাশিপুরের আলোচিত জোড়া খুনের ঘটনাস্থলে না গিয়েও শামীম ওসমানের নির্দেশে তাকে ও তার ভাইকে সেই মামলায় আসামি করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আরও মামলা হয়েছে। এই মানসিক চাপেই তার ছোট ভাই ব্রেন স্ট্রোক করে এখন শয্যাশায়ী বলে দাবি করেন তিনি। মজিদের দাবি, "সে বিএনপিকে কোনো সহযোগিতা করেনি। কাউকে করলেও তা নিজের স্বার্থেই করে থাকতে পারে।"

গুম ও ক্রসফায়ারের চেষ্টার শিকার হওয়ার সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ আমলে দলের একজন সাধারণ কর্মী থাকাকালীন তারেক রহমানকে নিয়ে করা একটি মন্তব্যের প্রতিবাদ করার কারণে শামীম ওসমানের নির্দেশে তাকে গুম করে ক্রসফায়ারে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। রনি বলেন, "সারা বাংলাদেশ জানে শামীম ওসমান মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছে। আর মিথ্যা কথা তিনি খুব ভালো বলতে পারেন।" এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ভাতিজা আজমেরী ওসমানের নির্দেশে গুলিতে ১৫ জন নিহত হওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়