২০ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:০০, ১৯ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ২১:০১, ১৯ আগস্ট ২০২৬

২৪ কোটি টাকার ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানিতে নারায়ণগঞ্জের ৪ পোশাক কারখানার নাম

২৪ কোটি টাকার ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানিতে নারায়ণগঞ্জের ৪ পোশাক কারখানার নাম

পণ্য রপ্তানি না করেই কাগজপত্রে রপ্তানি দেখানোর ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের চারটি পোশাক ও টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি যাচাই করতে গিয়ে দেশের আরও ৩ প্রতিষ্ঠানসহ এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট চালানে অন্তত ২৪ কোটি টাকার ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানির তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার আরটি ফ্যাশন, এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন এবং রূপগঞ্জের রূপসীর ভূঁইয়া ফেব্রিক্স।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সাতটি প্রতিষ্ঠানের ১২২টি চালানে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানই নারায়ণগঞ্জের।

কাস্টমসের তদন্তে দেখা গেছে, রপ্তানির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে চালান প্রক্রিয়াজাত করা হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট পণ্য বন্দরে আনা হয়নি। অর্থাৎ পণ্য ছাড়াই কাগজপত্রে রপ্তানি সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।

তদন্তে আরটি ফ্যাশনের একটি চালানের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে আসে। কাস্টমসের ব্যবস্থায় চালানটির ছাড়পত্রও দেওয়া হয় এবং সেটিকে দেশ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত দেখানো হয়। পরে যাচাই করে দেখা যায়, চালানটির কোনো পণ্যই বন্দরে ছিল না।

কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এসব ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানির ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকের পক্ষ থেকে চালান, ইনভয়েসসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করা হলেও বাস্তবে পণ্য বন্দরে প্রবেশ না করেই রপ্তানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধায় কাঁচামাল এনে পণ্য উৎপাদনের পর তা বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়ে এসব পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ পান।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানির সময় পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে কিছু রপ্তানিকারক বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন। পরে সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধ দেখাতেও ভুয়া রপ্তানির কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

দুটি ঘটনাই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বন্ডেড পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে পণ্যভেদে ৮৯ থেকে ১৫৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর দিতে হয়। তবে ভুয়া রপ্তানি দেখাতে পারলে এসব শুল্ক-কর পরিশোধ না করেই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ থাকে। পাশাপাশি সরকারের দেওয়া ২ শতাংশ নগদ রপ্তানি প্রণোদনা নেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রপ্তানি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের অনিয়ম করা হয়ে থাকতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরটি ফ্যাশন, এনএম ফ্যাশন ও এনএম নিট ফ্যাশনের মালিক নজরুল ইসলাম। ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের মাসদাইর ও গাবতলী এলাকায় তার আরও পোশাক কারখানা রয়েছে। অন্যদিকে রূপগঞ্জের রূপসীর খাদুন এলাকার ভূঁইয়া ফেব্রিক্সের মালিক মোস্তফা মনোয়ার ভূঁইয়া। তিনি নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক পদেও ছিলেন।

কাস্টমসের সন্দেহের সূত্রপাত হয় নজরুল ইসলামের আরটি ফ্যাশনের নথিপত্র যাচাইয়ের সময়। রপ্তানি ঘোষণায় অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করে কাস্টমস।

নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৪ মে আরটি ফ্যাশন সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের মাধ্যমে পোশাক রপ্তানির ঘোষণা দেয়। ওই চালানে পণ্যের ওজন এবং চালানের মোট ওজন একই দেখানো হয়। প্যাকেজিংয়ের কারণে পণ্যের ওজন ও চালানের ওজন সাধারণত একই হওয়ার কথা নয়। এ অসঙ্গতিই কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়।

পরে অন্যান্য নথিপত্র যাচাই করে রপ্তানির ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে পণ্য রপ্তানি না করার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তে আরটি ফ্যাশনের বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্র, স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে চালানটি রপ্তানি হিসেবে দেখানোর অভিযোগও উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আরটি ফ্যাশনের মালিক নজরুল ইসলাম ও তার ছেলে মো. সাকিবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে ভূঁইয়া ফেব্রিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা মনোয়ার ভূঁইয়া বলেন, তার কাছে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল এবং তিনি সেগুলো ‘যথাযথভাবে’ কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছে জমা দিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রপ্তানি না করেই ভুয়া চালান দেখানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জের চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম কাস্টমসের তদন্তে উঠে আসায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস আইসিডির কমিশনার আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান বলেন, বছরের প্রথম ছয় মাসের রপ্তানি নথি কাস্টমস যাচাই করছে। এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর এই প্রতারণার পুরো চিত্র কতটা বড়, তা স্পষ্ট হবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়