০৩ মার্চ ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২১:০০, ২ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ২১:৪৬, ২ মার্চ ২০২৬

জনপ্রিয়তা কি কাল হল আইভীর?

জনপ্রিয়তা কি কাল হল আইভীর?

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। নিজ দলের প্রভাবশালী নেতাকেও বিপুল ভোটে হারিয়েছিলেন প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহরের জনপ্রিয় সাবেক এ মেয়র। দেশের প্রথম নারী মেয়র আইভী সবসময় জনপ্রিয় ছিলেন তার সৎ, সাহসী ও আপোসহীন ভূমিকার কারণে। এই জনপ্রিয়তাই এবার কাল হয়েছে এ নারী রাজনীতিকের জন্য। গুম, খুন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে যিনি শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন নিজ দলেরই নেতাদের, কিন্তু তারপর দমে যাননি, তিনিই এখন রাত্রি-প্রহর কাটাচ্ছেন জেলের ভেতরে।

২০০৩ সাল থেকে দুই দশকের নগরপ্রধান হিসেবে কাটানো এ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে কখনো কোনো মামলা না হলেও গত ৯ মাস ধরে তিনি কারাবন্দি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত হত্যা ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগে করা মামলায়। এমন দশটি মামলায় হাই কোর্ট থেকে জামিন মিললেও মুক্তি মিলছে না তার। একের পর এক মামলায় নতুন করে তাকে গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার হাই কোর্ট আইভীকে পাঁচটি মামলায় জামিন দিলেও ওইদিনই বিকেলে পুলিশ নতুন আরেকটি হত্যা মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখায়। পুলিশের এ আচরণ ‘রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অভিযোগ করছেন আইভীর পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মীরা।

এমনকি স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে আইভীকে জেলের ভেতরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে রাজনৈতিক মহলের একটি পক্ষের। মূলত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের আগে সাবেক তিনবারের মেয়র জামিন পেলে এবং গণঅভ্যুত্থানের পর এ বিশেষ পরিস্থিতিতেও নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলে অনেকেরই ‘ভোটের মাঠের গণিত’ উল্টে যাবে। কেননা, বিগত সময়ে নগরবাসীর জন্য আইভীর ভূমিকা তাকে এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে রেখেছে। আর এতেই ভয় তার প্রতিপক্ষের। ফলে তার জনপ্রিয়তাকেই কারাবন্দির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখতে চাইছেন অনেকে।

আইভীর পরিবারের সদস্য ও তার পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমাজসেবার ‘ভূত’ ছোটবেলা থেকেই ছিল এ রাজনীতিকের। মানুষের সেবা করতে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সুদূর রাশিয়া থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়ে নিউজিল্যান্ডে আয়েশি জীবন ফেলে ফিরে এসেছিলেন বাংলাদেশে, নিজ জন্মভূমি নারায়ণগঞ্জ শহরে। নিজ ভূমির মানুষের প্রতি এ দরদ তিনি অনুভব করতেন পিতা আলী আহাম্মদ চুনকার মধ্য দিয়েই। শ্রমিক রাজনীতি থেকে উঠে আসা চুনকা হয়ে উঠেছিলেন নারায়ণগঞ্জবাসীর ‘চুনকা ভাই’। স্বাধীন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।

রাজনীতিতে আসার কথা না থাকলেও ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয়। রাজনীতির মাঠেও তার দক্ষতার প্রমাণ মেলে- যখন বিএনপির প্রভাবশালী নেতাকে তিনি বড় ব্যবধানে পরাজিত করেন। এরপর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানকে হারান লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। সেবারের নির্বাচনে তিনি মূলত ছিলেন ‘গডফাদারতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক।

দুই দশক জনপ্রতিনিধি থাকাবস্থায় দলবাজি না করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাতাশটি ওয়ার্ডের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। যার উদাহরণ এখনো দেন নগরবাসী। অবকাঠামোগত উন্নয়নই কেবল নয় নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে গেছেন আইভী। এ নগরীর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দখলদারদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। এমনকি নিজ দল এবং দলীয় সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও একাধিকবার দাঁড়িয়েছেন। আলোচিত কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা, সাতখুন, তরুণ নাট্যকর্মী দিদারুল আলম চঞ্চল, তরুণ ব্যবসায়ী আশিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে নিজ দলের জড়িত থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পিছ পা হননি। শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্য-অনুসারীদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও এ শহরের সবচেয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন আইভী। এজন্য ২০১৮ সালে হত্যাচেষ্টার মুখোমুখিও হতে হয় সাবেক এ মেয়রকে।

আইভীর ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ন্যায্যতার সঙ্গে ছিলেন তিনি। কোনো প্রকার সহিসংতার পক্ষে তিনি থাকেননি। শামীম ওসমান ও তার অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতারা যখন ছাত্র-জনতার উপর সশস্ত্র হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তখন আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো সভা-সমাবেশে অংশও নেননি। বরং আন্দোলনের সময় নগরভবন ভাঙচুরের পেছনে বন্দরের এক যুবলীগ নেতার অনুসারীদের সম্পৃক্ততার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন তিনি। ভাঙচুরের এ ঘটনায় আটকরাও ছিলেন ওই নেতার অনুসারী।

আন্দোলনে সহিংসতায় অংশ না নেওয়া আইভী তাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ছিলেন নির্ভার। দলের অনেক নেতারা যখন পালিয়ে বেরিয়েছেন তখন তিনি ছিলেন নিজ বাড়িতেই। তাকে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার মেয়র পদ থেকে সরানোর আগ পর্যন্ত নগরভবনের দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু মেয়র পদ থেকে অপসারণের কয়েকদিন পরই তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাগুলো রুজু হতে থাকে।

আইভীর পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা বলছেন, এসব মামলায় বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সাবেক এ মেয়র জড়িত নন। ঘটনাস্থলেও তিনি ছিলেন না। এমনকি আন্দোলন-বিরোধী মন্তব্যও তিনি পুরো সময়জুড়ে করেননি। কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাকে কারাবন্দি রাখা হচ্ছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

আইভীর কারাবাসকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। তার জনপ্রিয়তা কি সত্যিই রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ, নাকি আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা- এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।

সব মিলিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারাবাস কেবল একটি ব্যক্তিগত বা আইনি ঘটনা নয়, এটি এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে আদালত থেকে ধারাবাহিক জামিন, অন্যদিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা, এসবই জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তার সমর্থকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী প্রভাবই তাকে রাজনৈতিক টার্গেটে পরিণত করেছে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট- নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী এখনো প্রভাবশালী একটি নাম। আসন্ন সিটি নির্বাচন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত- এসবের ওপর নির্ভর করবে তার রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়