‘শিক্ষকের অবসর হয় না’
চারুকলায় ২৩ বছর, জন্মদিনে বিদায় নিলেন সামছুল আজাদ
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ‘আগুনের পরশমণি’ গানের সুর। এরপর অতিথিদের হাতে একে একে জ্বলে ওঠে প্রদীপ। আলোর সেই আবহে কেক কেটে উদযাপন করা হয় শিল্পী মো. সামছুল আলম আজাদের ৬০তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনন্দের সঙ্গে তখন মিশে যায় বিদায়ের বিষাদ। এর মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটে তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের কর্মজীবনেরও সমাপ্তি ঘটে।
কেক কাটা, প্রদীপ প্রজ্বালন, গান আর স্মৃতিচারণে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আনন্দ-বিষাদের এক আবেগঘন আয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, স্মৃতিচারণ করেন এবং উপহার তুলে দেন।
নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক রেজা আসাদ আল হুদা অনুপমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির দাতা সদস্য রফিউর রাব্বি, সাবেক সভাপতি বদিউর আলম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল প্রাং, গভর্নিং বডির সদস্য জহিরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য ভবানী শংকর রায়, অধ্যাপক শহীদ আহমেদ মিঠু, সাবেক অধ্যাপক রাশেদুল হুদা সরকার, সাবেক শিক্ষক লুবনা তারাননুম, প্রাক্তন শিক্ষার্থী তারিকুল ইসলামসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
তবে বিদায়ের দিনে সামছুল আজাদের কথায় শেষ হয়ে যাওয়ার কোনো আক্ষেপ নয়, উঠে আসে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং এখনো বাকি থাকা কাজের কথা।
সামছুল আজাদ বলেন, “আমি এখনো অনুভব করি না যে আমার চাকরির সময় শেষ। কালকেও কলেজে আসবো, অনেক কাজ বাকি। আমি যার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকি, তার সবকিছুকেই দায়িত্ব মনে হয় আমার।”
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শেখানো, তাদের পাশে থাকা এবং তাদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করাকেই তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, “এই কলেজে এ পর্যন্ত যত শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, আমার সবসময় মনে হয়, ওদের শেখানো, জানানো ও পাস করানোর দায় আমার।”
অবসর প্রসঙ্গে সামছুল আজাদ বলেন, “শিক্ষকের অবসর হয় না।” অনলাইন পাঠদানের মাধ্যমে এখনো অনেক শিল্পী-শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত তাদের কাজ দেখে পরামর্শ ও মতামত দেন।
শিক্ষার্থীদের সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চারুকলার শিক্ষার্থীদের অর্জনই তাঁর পরিচয়কে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মিনিয়েচার প্রদর্শনীতে চারুকলার শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রবিনের গ্র্যান্ড পুরস্কার পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সামছুল আজাদ বলেন, “আমার দেশ বা আমার গ্রামের বাড়ি কোথায়, এখন কেউ আর জানে না। শিল্পী মহলে আমার পরিচয় নারায়ণগঞ্জের সামছুল।”
চারুকলা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সামছুল আজাদের দীর্ঘ পথচলার কথাও উঠে আসে অনুষ্ঠানে। যে জায়গায় এখন প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে আছে, একসময় সেখানে ছিল ময়লার ভাগাড়। নানা মানুষের শ্রম ও অবদানে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে সামছুল আজাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন দাতা সদস্য রফিউর রাব্বি।
তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। চারুকলায় আসা শিক্ষার্থীদের নানা প্রতিকূলতা ও সংকট বুঝে তাদের বিকাশে সহায়তা করা গুরুত্বপূর্ণ। সামছুল আজাদ সেই কাজটি যথাযথভাবে করেছেন।
রফিউর রাব্বি আরও বলেন, “এখানে শেষ হওয়ার কিছু নেই। আজাদ আজ নতুন যাত্রা শুরু করবে। জীবনের বড় একটি প্ল্যাটফর্মে আমরা তাকে দেখবো। নতুন করে আজাদ নিজেকে আবিষ্কার করবে।”
প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সামছুল আজাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক রেজা আসাদ আল হুদা অনুপম।
তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠান অনেকে তৈরি করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুটি দিক থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক, অন্যটি একাডেমিক। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক রূপ দেওয়া অনেক কঠিন। যেটা অধ্যক্ষ সামছুল আজাদ করে গেছেন। এই জায়গায় তিনি তাঁর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে গেছেন।”
প্রদীপের আলো, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠের গান ও জন্মদিনের কেক কাটার আনন্দে শুরু হওয়া আয়োজন শেষ হয় বিদায়ের আবেগে। চারুকলায় সামছুল আলম আজাদের ২৩ বছরের কর্মজীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও তাঁর নিজের কথায়, ‘কাজ এখনো অনেক বাকি’। তাই এই বিদায় হয়তো শেষ নয়; শিল্প, শিক্ষকতা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায়ের শুরু।





































