জীবনী পাঠ, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে শিশু সংগঠক রেখা গুণকে স্মরণ
জীবনী পাঠ, স্মৃতিচারণ, গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হলো একতা খেলাঘর আসরের সাবেক সভাপতি, শিশু সংগঠক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত রেখা গুণকে। সংগ্রাম, মানবিকতা, মমতা এবং শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য পরিচিত এই সংগঠকের কর্মময় জীবনের নানা অধ্যায় স্মরণ করেন তাঁর সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্বজনরা। বক্তারা বলেন, রেখা গুণ শুধু একজন সংগঠকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি আদর্শ, একটি প্রেরণার নাম। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে শহরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনের পঞ্চম তলার পরীক্ষণ থিয়েটার (এক্সপেরিমেন্টাল) হলে একতা খেলাঘর আসরের উদ্যোগে এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রয়াত এই সংগঠকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘আগুনের পরশমণি’-র সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এরপর সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক দিপ্ত দেবনাথ রেখা গুণের জীবন ও কর্মের ওপর জীবনী পাঠ করেন।
জীবনী পাঠে উঠে আসে রেখা গুণের সংগ্রামী জীবনের নানা অধ্যায়। রাজনৈতিক আদর্শে বেড়ে ওঠা পরিবারে তাঁর শৈশব, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সমমনা এবং একতা খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরা হয়। শিশু-কিশোরদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ, সহযোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিকতা এবং পরিবার-পরিজনকে ঘিরে মানবিক এক বন্ধনের উদাহরণও আলোচনায় উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রেখা গুণ সংগ্রামকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেছেন। মরণব্যাধী ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেও তিনি কখনো মনোবল হারাননি। তাঁর এই সাহসিকতা ও জীবনবোধ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সদস্য সচিব সুব্রত রায়। স্মৃতিচারণ করেন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শিশু সংগঠক রথীন চক্রবর্তী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রী লক্ষ্মী চক্রবর্তী, রীনা আহমেদ, মঞ্জুশ্রী দাস, সিপিবির শিবনাথ চক্রবর্তী, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের মণি সুপান্থ, উন্মেষের প্রদীপ ঘোষ, উদীচীর জাহিদুল হক, ভবানী শংকর, ফুয়াদ মহসিন, রবিউল ইসলাম শশী এবং রেখা গুণের স্বজন জিসান রায়।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে রেখা গুণের ব্যক্তি জীবন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, প্রগতিশীল আন্দোলনে ভূমিকা এবং মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, শৈশব থেকে শুরু করে কর্মজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শিশুদের কাছে ছিলেন একজন স্নেহময় অভিভাবক, সহকর্মীদের কাছে নির্ভরতার প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কাছে ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
বক্তারা আরও বলেন, একতা খেলাঘর আসর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, উদীচী, প্রগতিশীল আন্দোলন এবং নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রেখা গুণের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর স্নেহে বড় হওয়া শিশুদের স্মৃতিতে, সহযোদ্ধাদের হৃদয়ে এবং মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্নে।
স্মরণসভায় রেখা গুণের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন দীপক ভৌমিক, রাজলক্ষ্মী, ডলি বণিক ও জিয়াউল ইসলাম। গান পরিবেশন করেন অপরাজিতা রায়। এছাড়া রেখা গুণের প্রিয় গান ‘আগুনের পরশমণি’-তে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পী জিসান ও তাথৈ সাহা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অমিতাভ চক্রবর্তী, মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল, সুমন সাহা, অনিক সাহা, রেখা গুণের ভাই সমাপ্তসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সংস্কৃতিকর্মী, শিশু সংগঠক এবং শুভানুধ্যায়ীরা।
স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন একতা খেলাঘর আসরের সহ-সভাপতি হাফিজুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সভাপতি সুমিত রায়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক দুর্ঘটনায় কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর রেখা গুণ দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর মনোবল ছিল অদম্য। অবশেষে চলতি বছরের ৩০ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর সংগ্রামী জীবন, মানবিক মূল্যবোধ ও শিশুপ্রেম আগামী দিনেও সমাজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।





































