৩ নভেম্বরের গার্মেন্ট শ্রমিক অভ্যুত্থান ও কিছু আলাপ
৮০ দশকে হামাগুড়ি দেয়া রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমান বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির ইতিহাসটা সরলরেখা বরাবর চলে নাই। একটা দিক হইলো অর্থনীতির নানান মারপ্যাঁচ, ব্যাংকলোন থেকে শুরু করে রপ্তানির বিপরীতে ইনসেন্টিভ সুবিধা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় দিকটা মৃতশ্রম অর্থাৎ আমদানিকৃত মেশিনগুলায় গ্রাম থাইকা উইঠা আসা তরুণ-তরুণীর সবুজ জোড়া হাতে সুতার ফোঁড়ন তোলার গল্প। নামীদামি ব্র্যান্ডের টি-শার্ট নীল নোনাজল পাড়ি দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার “সভ্য” নাগরিকদের আরামের জোগান দেয়। সেই পোশাকের মসৃণ বুননের ভিতর জীবন্ত মানুষগুলার খবর কে রাখে? ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার খাটুনিতে শরীরের যে পরিমাণ ক্ষয় তা পূরণের প্রয়োজনীয় ক্যালরি, মানসম্পন্ন বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষার খরচের জন্য যে পরিমাণ টাকা প্রয়োজন বর্তমান মজুরিতে কি তা পূরণ করা অসম্ভব। আর চিকিৎসা সে তো শ্রমিকদের বিলাসিতা। বিনোদন বলতে মুসলমানপ্রধান জনগোষ্ঠী হিসাবে ২টা ঈদে গ্রামে বেড়াতে যাওয়া। প্রয়োজনীয় ক্যালরি পূরণে অক্ষম একজন শ্রমিক যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে তার নিজের শরীর খেয়ে টিকে থাকে। এই রুগ্ণ টিকে থাকা শরীরও ভবনচাপায় কিংবা পুড়ে ছাই হতে পারে যেকোনো সময়। এই শিল্পের ইতিহাসে ছোট ঘটনাগুলো বাদ দিলেও স্পেকট্রাম, ২০১১ তে তাজরীন, ২০১৩ রানাপ্লাজার ভয়াবহ কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডে হাজারো নরনারী নির্মম শিকার হন। আওয়ামী সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর খুনিদের আড়াল করতে এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড বিএনপির ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে বলছিলেন “রানাপ্লাজার পিলার ধরে বিরোধী দলের সন্ত্রাসীরা ঝাকি দিয়ে ভবন ধসিয়েছে”!
এই নির্যাতনের বিপরীতে শ্রমিকরা গড়ে তুলেছে প্রতিরোধের লড়াই। মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, গণতান্ত্রিক শ্রম-আইনের দাবিতে লড়াই করতে গিয়ে রক্ত ঝরেছে রাজপথে। রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের পর বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের চাইতেও ২০০৬ সালে জাতীয় মজুরির দাবিতে সারা দেশের শিল্পাঞ্চলে অভ্যুত্থান পরিস্থিতি তৈরি হয়। জাতীয়ভাবে ২০০৬ গার্মেন্ট আন্দোলন সবচাই শক্তিশালী ও জোরালো আন্দোলন। ২০০৬ সালের লড়াইয়ের ভিত্তি তৈরি করেছিলো ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্ট শ্রমিক অভ্যুত্থান। ৩ নভেম্বর ২০০৩ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত পেনটেক্স ড্রেস লিমিটেড কারখানায় বকেয়া মজুরি, ঈদ বোনাসসহ ন্যায়সংগত দাবিতে শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। সেই ধর্মঘটে সরকারি গুন্ডাবাহিনী সশস্ত্র হামলা করে। পুলিশ শত শত রাউন্ড গুলি চালায়। আমজাদ হোসেন কামাল পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। তৎকালীন বিএনপি সরকার নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে আন্দোলন দমন করতে নেমেছিলো। তার ফল হয়েছিলো উল্টো। সকাল হতেই লাখো শ্রমিক পুরো নারায়ণগঞ্জ শহর দখল করে। ফতুল্লা থানায় আটক শ্রমিকনেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইলকে থানা ভেঙে মুক্ত করে। সকল পুলিশ ভয়ে থানা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির লড়াইটা ছিলো অনন্যসুন্দর। এটাই ছিলো পোশাক শ্রমিকদের প্রথম অভ্যুত্থান। টানা ৩ দিন নারায়ণগঞ্জ শহর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ, সরকার ও শ্রমিকনেতাদের সমন্বয়ে মিটিং করে শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ১৮ দফা মানতে বাধ্য করে। দাবি অনুযায়ী মজুরি, কর্মঘণ্টার সমস্যা কিছুটা সমাধান হলেও আমজাদ হোসেন কামাল হত্যার বিচার আজও হয় নাই।
চলমান এই সময়েও শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে আছে। চীন-ভিয়েতনাম এমনকি ভারত-পাকিস্তানের চাইতেও বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকের মজুরি কম! প্রকৃত মজুরি অর্থাৎ চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের বাজারমূল্য হিসাবে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক। শ্রমিকের মজুরি বাড়া কেবল শ্রমিকেরই লাভ নয় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিকাশের প্রশ্নও জড়িত। সম্মানজনক মজুরি আত্মমর্যাদা, শিল্পের বিকাশ এবং একইসাথে কার্যকর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াও জড়িত।
লেখক: অঞ্জন দাস (কেন্দ্রীয় বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক গণসংহতি আন্দোলন)





































