ত্বকীর জন্মদিনে এলিজি
৫ অক্টোবর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর জন্মদিন। ৩১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৫ সালের এই দিনে ত্বকীর জন্ম। কালের চক্রে ত্বকীর বয়স বেড়ে চললেও বয়স তার আটকে আছে ১৭ বছর ৫ মাসের বৃত্তে। পিটার প্যানের মতো ত্বকীর বয়স আর বাড়বে না কোনোদিন। তবে পিটার প্যান চিরদিন কিশোর হয়ে থাকার জন্য পণ করেছিল; কিন্তু ত্বকী তা চায়নি। ত্বকী বড় হতে চেয়েছিল, অনেক বড়। সবকিছু ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিল।
জন্মদিন হয় আনন্দের। ফুল, কেক, উপহার, শুভেচ্ছা-অভিবাদন বিভিন্ন কিছু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ত্বকীর জন্মদিন আমাদের জন্য কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনে না। এ দিন আমাদের হৃদয় খুঁড়ে বেদনাকে জাগিয়ে তোলে।
ত্বকী তার একটি কবিতায় লিখেছিল
‘সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে,
হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে,
জলাঞ্জলি দিয়ে হিসাব কষা,
ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান,
বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।’
বিরুদ্ধ এক সমাজে বসে সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল ত্বকী। কিন্তু সমাজ কতটা বিরুদ্ধ, দুঃস্বপ্নের এবং কতটা দুঃসময় বয়ে চলেছে, সে ধারণা হয়তো ওর ছিল না।
‘ডাকঘর’-এর কিশোর অমল দইওয়ালা হতে চেয়েছিল, হতে পারেনি। শৈশব-কৈশোরে বিচিত্র সব স্বপ্ন এসে ভিড় করে। ত্বকী শৈশবে আর্মি হতে চেয়েছিল। ওর মনে হয়েছিল, তারা খুব সাহসী; দেশ-বিদেশে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ওর বাবা জলপাই ছাপের জ্যাকেট ও ট্রাউজার এনে দিয়েছিলেন। পেয়ে আনন্দ আর ধরে না। শৈশবের স্বপ্নগুলো দ্রুত বদলে যায়। পরে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদায় নিল।
ত্বকী একটি ছড়া প্রায়ই শুনতে চাইত ‘মন্দরা ছিল, মন্দরা আছে, থাকবেও চিরকাল; তবুও ভালোর ছোঁয়া লেগে শুভ হোক আগামীকাল।’
আমি যখনই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানুষ’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করতাম ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’ তখন প্রতিবারই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার শিশুসন্তান আপনমনে বলে চলত, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমাকে দাঁড়াতেই হবে।’
এখন আমার কণ্ঠ থেকে কোনো ছড়া, কবিতা বা গান বের হয় না। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। কিন্তু আমার চোখের জলে কোনো স্মৃতি মুছে যায়নি। ত্বকীর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুহূর্ত থেকে আমি ফিরে পেতে চাই বর্তমান ও ভবিষ্যতে ত্বকীর সঙ্গে আমার জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা যা হয়তো আর কোনোদিন হওয়ার নয়।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ পাঠাগার থেকে বই আনার পথে দুর্বৃত্তরা ত্বকীকে তুলে নিয়ে যায় শহরের পরিচিত আল্লামা ইকবাল রোডের একটি টর্চার সেলে। সেখানেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ওই রাতেই তার লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৪ বছর হতে চললেও আজও অভিযোগপত্র তৈরি হলো না। সরকার যায়, সরকার আসে বিচার হয় না।
এখানে সংবিধান মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে না, স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে পারে না; মৃত্যু হলে বিচার পাওয়ার অধিকার পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারে না। প্রতিনিয়ত সংবিধান লঙ্ঘনের অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এখানে অপরাধীরা প্রতিনিয়ত সরকারের প্রশ্রয় পায়। সবকিছু জানার পরেও রাষ্ট্র, সরকার অপরাধীদের পক্ষ নেয়, হত্যাকারীদের পাশে দাঁড়ায়। সবকিছু উদ্ঘাটনের পরেও বিচার আটকে থাকে। আমরা কি এমনই স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম? একেই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বলব?
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ত্বকীর এ-লেভেল পরীক্ষার প্রথম পর্বের ফল প্রকাশিত হলো। পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বের সর্বোচ্চ নম্বর এবং রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল সে। এর আগে ও-লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘ডেইলি স্টার’ পুরস্কার নিতে গিয়ে পরিচিতি প্রকাশে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে লিখেছিল, ‘সততাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লালন করব।’
জীবনের পরিসীমা যেখানে এতই ছোট, সেখানে লক্ষ্য কেবল মুখ থুবড়ে পড়ে। চেনা দেশ, চেনা চারপাশ অচেনা হয়ে যায়। দুঃখের জমি কতটা আবাদ করা যায়? সেখানে সবসময় তো ফুল ফোটে না। কখনো ফোটে, কখনো ফোটে না। কিন্তু মানুষ তো স্বপ্ন ছাড়া বাঁচে না।
ত্বকীর জন্মদিনে তাই একগুচ্ছ দুঃখের ফুল।
রওনক রেহানা
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা





































