বৃত্তের বাইরে রফিউর রাব্বি
রফিউর রাব্বি অনেক পরিচয়ে পরিচিত। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমুখী বহু কাজে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। নিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মানবহিতৈষী নানা উদ্যোগে। তবে তাঁর কর্মমুখর সত্তার গভীরে রয়েছে অন্তঃসলিলা এক শিল্পীসত্তা। নিজে তিনি চিত্রশিল্পী; তাঁর চেয়ে বড় কথা, তিনি সংবেদনশীল এক লেখক, নানা বিষয়ে যাঁর আগ্রহ। কর্মের ডাকে তিনি সর্বদা সাড়া দিয়ে চলেন। ফলে লেখালেখির জগতের হাতছানিতে প্রলুব্ধ হওয়ার অবকাশ তাঁর বিশেষ মেলে না। কিন্তু তারপরও শিল্প-সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস কিংবা নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ বিশেষভাবে বিদগ্ধজনের দৃষ্টি কাড়ে।
রফিউর রাব্বির জন্ম ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরে। বাবা ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শাহাদাত হোসেন, পেশায় চিকিৎসক; মা আনোয়ারা হোসেন। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল, তোলারাম কলেজ, চারুকলা ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাভানার ইস্কুয়েলা সুপিরিয়র নিকোলোপেজে। তবে তাঁর জবানিতে, তিনি মূল পাঠ নিয়েছেন প্রকৃতি, মানুষ ও মানবসভ্যতার ধাবমান কাল থেকে। কৈশোর থেকেই শিল্প-সংস্কৃতি ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আবহে ভরা একটি পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তিনি।
তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৭৬ সালে তিনি দেশের ও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখা নিয়ে নিজ সম্পাদনায় ‘রবিস্বর্গ’ সংকলন প্রকাশ করেন। এটি তাঁর সম্পাদনায় প্রথম সংকলন। রফিউর রাব্বি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করছেন। লেখালেখিতে কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও তাঁর বিচরণ মূলত প্রবন্ধ-সাহিত্যে। বেশ কিছু কবিতার অনুবাদও তিনি করেছেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে মানুষের চিরায়ত সংগ্রাম, দুঃখবোধ আর মানুষে মানুষে যূথবদ্ধতা। তাঁর লেখার বড় একটি জায়গাজুড়ে রয়েছে ধাবমান মানবজাতির কাব্যময় জীবনের উপাখ্যান আর তার ইতিহাসবোধ।
রফিউর রাব্বি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজের স্তরে স্তরে জমে থাকা ক্লেদ, বৈষম্য ও অচলায়তন অপসারণের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি ১৯৯৪ সালে রওনক রেহানাকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী ও রাকিব মুহাম্মদ সাকি। ২০১৩ সালে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে।
রফিউর রাব্বি বিভিন্ন গ্রন্থ ও সংকলন সম্পাদনা করেছেন। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর চিত্রকলা বিষয়ক গ্রন্থ “ভিঞ্চি পিকাসো হুসেন সুলতান ও অন্যান্য” এবং শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ “শিল্পের ঘর বসতি”। ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন”। ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয় নারায়ণগঞ্জ জেলার শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গবেষণাগ্রন্থ “নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য” এবং প্রবন্ধগ্রন্থ “বৃত্তের বাইরে”।
নারায়ণগঞ্জের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রফিউর রাব্বির নাম; বহু কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত। নারায়ণগঞ্জ আজ নানা দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। সারা বাংলাদেশে যখন নানা রকম অন্ধতা গ্রাস করছে, তখন নারায়ণগঞ্জ আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। নারায়ণগঞ্জে নানা রকমভাবে প্রদীপ প্রজ্বালন ঘটছে আক্ষরিক অর্থে, বাস্তব অর্থেও। মানুষের অন্তরে এই প্রদীপ জ্বালানোর যে আয়োজন, সেটিও নারায়ণগঞ্জ নানাভাবে করে চলেছে। আমরা বাইরে থেকে নারায়ণগঞ্জকে তাই অভিবাদন জানাই। আর নারায়ণগঞ্জে এ কাজের কাণ্ডারি হিসেবে অভিনন্দন জানাই রফিউর রাব্বিকে।
মফিদুল হক
লেখক, গবেষক ও ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর





































