‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ মন্তব্য, বারবার অস্বস্তিতে হাতেম
নিট পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলাকে কেন্দ্র করে এনসিপির এমপিকে ২ ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ইতোমধ্যে আলোচিত। তবে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সখ্যতা ও আন্দোলন-বিরোধী অবস্থানের আলোচনায় এর আগেও একাধিবার অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে হাতেমকে।
এমনকি আন্দোলনের মুখে একটি অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যেতেও বাধ্য হন এ ব্যবসায়ী নেতা। এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে একাধিকবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে বিকেএমইএ সভাপতিকে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ মন্তব্য করে হাতেমের অনুসারী ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের রোষের মুখে পড়েন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও দলটি থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন।
বিসিক শিল্পাঞ্চলে একটি পোশাক কারখানায় অবরুদ্ধ থাকার সময় নিচে বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রাসেল মাহমুদ। ওই সময়ের একটি ভিডিওতে রাসেলকে বলতে শোনা যায়, ‘এমপি প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে’ তারা অবস্থান ছাড়বেন না।
এনসিপির সংসদ সদস্য আল আমিনের অভিযোগ, নিচে তার দলের নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেলে বিসিক শিল্পাঞ্চলের একটি পোশাক কারখানার চতুর্থ তলায় ইফতারের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামীর পেশাজীবী ফোরাম। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিসিক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও নিট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। ওই সময় একই মঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বক্তব্যে ‘ফ্যাসিস্টের দোসররা’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত আছেন বলে মন্তব্য করেন।
এমন মন্তব্য করার পরই হাতেম ও তার অনুসারীরা অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান এবং হট্টগোল শুরু হয়। ইফতারের পর ওই পোশাক কারখানার নিচে কয়েকশ’ মানুষ অবস্থান নেন। ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন সংসদ সদস্য আল আমিন। দুই ঘন্টার পর রাত আটটার দিকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে শহরের চাষাঢ়ায় এনসিপির কার্যালয়ে নিয়ে আসে।
ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ হাতেমের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তিনি নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা একেএম সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেলিম ওসমান ছিলেন বিকেএমইএ’র সভাপতি এবং হাতেম নির্বাহী সভাপতি। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে থাকা সেলিম ওসমান চিঠি দিয়ে সভাপতি পদে হাতেমকে সুপারিশও করেন।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন-বিরোধী অবস্থানে থাকারও অভিযোগ রয়েছে হাতেমের বিরুদ্ধে। গণঅভ্যুত্থানের দুইদিন আগে ওই বছরের ৩ ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় অংশ নেন মোহাম্মদ হাতেম। ওই সময় বক্তব্যে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ‘তান্ডব’ মন্তব্য করে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছিলেন অভিযোগ রয়েছে। এবং ব্যবসায়ীরা সবসময় সরকারের পাশে আছে বলেও উল্লেখ করেন বক্তব্যে।
আন্দোলন চলাকালীন ভূমিকার জন্য এর আগেও অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের পর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বিকেএমইএ’র নির্বাচনে সভাপতি পদে বিজয়ী হওয়া মোহাম্মদ হাতেমকে। গত ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজেও একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তখনও তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। ওই সময় ছাত্রদলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। তোপের মুখে এক সময় অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন হাতেম।
তার আগে একটি গণমাধ্যমের অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ হাতেমের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান নারায়ণগঞ্জভিত্তিক একটি অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক সীমান্ত প্রধান। শিল্পকলা একাডেমীতে প্রশাসনের একটি অনুষ্ঠানেও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন ‘ফ্যাসিস্টের দোসর বা সহযোগীদের’ প্রসঙ্গ টেনে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এদিকে, আন্দোলনের সময়ে মোহাম্মদ হাতেমের ভূমিকা ও গণভবনে তার দেওয়া বক্তব্যের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন।
যদিও সম্প্রতি একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে মোহাম্মদ হাতেম দাবি করেছেন, তিনি আন্দোলন চলাকালীন ছাত্রলীগের হামলাকে ‘তান্ডব’ হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন।
এর আগে বিকেএমইএ’র নির্বাচনের আগেও এক সংবাদ সম্মেলনে হাতেম দাবি করেছিলেন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধির বাইরে তার সঙ্গে বিগত সরকারের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি বরং সেলিম ওসমানের কারণে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সভাপতি হতে পারেননি বলেও জানান।





































