হয়রানিমুক্ত ভূমি অফিসের নাগরিক সেবা কি নিশ্চিত হবে?
জমি-জমা সংক্রান্ত যেকোনো সেবা নিতে সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসার জায়গা ভূমি অফিস। নামজারি, খতিয়ান সংশোধন, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা জমির রেকর্ড সংক্রান্ত কাজে প্রতিদিনই এসব কার্যালয়ে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। অথচ সেই ভূমি অফিসেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি, সময়মতো অফিসে না আসা, হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে- জনবান্ধব ভূমি অফিসের নাগরিক সেবা কি আদৌ নিশ্চিত হবে?
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে সদর উপজেলা ভূমি অফিসে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের আকস্মিক পরিদর্শনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের বিষয়টি সামনে আসে। পরে দুই এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
ঘটনাটি এখানেই থেমে নেই। এর আগেও সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে নির্ধারিত সময়ের পরও অফিস তালাবদ্ধ পাওয়া এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সামনে এসেছিল। কয়েক মাসের ব্যবধানে দুই ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ভূমি অফিসের একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ায় বিষয়টি এখন নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
এমনকি, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরও ভূমি অফিসের সেবার মান নিশ্চিত ও হয়রানি বন্ধে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। নিজে আকস্মিক ভূমি অফিসগুলো পরিদর্শনও করেছেন। ভূমি সংক্রান্ত অফিসগুলোতে দালালমুক্ত করতেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
তবে, প্রশ্ন উঠছে, একজন মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আকস্মিক পরিদর্শনে গেলেই যদি অফিসের এমন চিত্র দেখা যায়, তাহলে সাধারণ নাগরিক প্রতিদিন যে ভূমি অফিসে সেবা নিতে যাচ্ছেন, সেখানে নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর?
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ভূমি অফিসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে গিয়ে তাদের দীর্ঘদিন ধরে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি, কেনা জমির রেকর্ড সংশোধন কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ- প্রায় প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রেই হয়রানি ও দেরির অভিযোগ রয়েছে। কারও কারও অভিযোগ, নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে তাদের বারবার অফিসে আসতে বলা হয়।
আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ঘুষ লেনদেন নিয়ে। সেবাগ্রহীতাদের একটি অংশের দাবি, আর্থিক সুবিধা না দিলে ফাইল দ্রুত নড়ে না। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সময়ের বাইরে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সেবা দেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও জনবান্ধব করতে ডিজিটাল সেবা চালুসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্প ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ভূমি সংক্রান্ত সেবার গুরুত্ব আরও বেশি। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসনসহ বিভিন্ন কারণে জমির লেনদেন ও রেকর্ড সংক্রান্ত সেবার চাহিদা ব্যাপক। ফলে ভূমি অফিসে কোনো ধরনের অনিয়ম বা হয়রানি শুধু একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত ভোগান্তি নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা-বিনিয়োগসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও।
তাই, প্রশ্নটি শুধু ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ করা কিংবা কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নয়। বরং প্রশ্ন হলো- ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে স্থায়ীভাবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সেবাগ্রহীতাদের মতে, অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সেবার সময়সীমা কঠোরভাবে মানা এবং ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে একজন নাগরিক যেন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল না হন- এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। সরকারি দায়িত্বকে দায়িত্ব হিসেবেই পালন করতে হবে; নাগরিককে সেবা দেওয়া কোনো দয়া নয়।
দুই ভূমি প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে যে বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে, সেটি প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, শোকজ ও তদন্তের পর ব্যবস্থা কতটা দৃশ্যমান হয় এবং সেই সঙ্গে ভূমি অফিসগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায় কিনা।





































