ভোটের মাঠে ‘কঠিন পরীক্ষায়’ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা
ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলীয় জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকলেও শেষ মুহুর্তে বেরিয়ে আসা দলটি এখন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া দলটির প্রার্থীদের সামনে কেবল বিজয়ী হওয়া নয়, জোটের প্রার্থীদের চেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সক্ষমতার পরিসংখ্যানে ভোটের মাঠে তারা তা কতটুকু অর্জন করতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
তবে, অভূতপূর্ব ফলাফল অর্জনের লক্ষ্য রেখেই নির্বাচনি মাঠে দলটির প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা সক্রিয় রয়েছেন। চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। ভোটারদেরও কাক্সিক্ষত সাড়া পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন তারা।
ইসলামী আদর্শকে সামনে রেখে চরমোনাই পীরকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইসলামপন্থী এ রাজনৈতিক দলটি ২০০৮ সাল থেকে এককভাবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে সফলতা অর্জন করতে না পারলেও নারায়ণগঞ্জ জেলায় তাদের একটি সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর দেশে একটি ইসলামি শক্তির উত্থানের সক্রিয় চেষ্টায় ছিল দলটি। শুরুতে পাঁচদলীয় এবং পরে ১১ দলীয় জোটে রূপ নেয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে জোট থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন। দলটির অভিযোগ ছিল, জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামী ‘কর্তৃত্বপরায়ন’ হয়ে উঠেছিল।
ইসলামী আন্দোলনের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা মত থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটে থাকলে জেলায় নিজেদের বাইরেও আলাদা কিছু ভোট অর্জন সম্ভবনা বেশি ছিল। কিন্তু তা ফলাফলে পরিবর্তন আনতে পারতো না। বরং একক নির্বাচনের ইতিহাস থেকে ইসলামী আন্দোলন খুব ক্ষতির মুখে তাদের পড়তে হচ্ছে না। যদিও ভোটের মাঠে জোটের একটি প্রভাব তো থাকছেই।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এটি দলটির তৃতীয় অংশগ্রহণ। আগের দুই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলায় দলটির গড় ভোটের হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ভোটের হার তুলনামূলক কম হলেও প্রায় প্রতিটি আসনেই দলটির প্রার্থীরা তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন। তাদের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল অর্জিত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে।
তবে, সংসদ নির্বাচনের আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি ভোট রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে। এ দু’টি আসনে তাদের গড় ভোট সাড়ে তিন শতাংশের কিছু বেশি। এরপর নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে দেড় শতাংশ, এবং সর্বনি¤œ নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে প্রায় এক শতাংশ ভোট রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে দলটি থেকে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মো. ইমদাদুল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে মো. হাবিবুল্লাহ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে গোলাম মসীহ, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি ইসমাইল কাউসার, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মুফতি মাছুম বিল্লাহ ‘হাতপাখা’ প্রতীকে লড়ছেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ইমদাদুল্লাহ একজন প্রবীণ নেতা। তিনি বর্তমানে রূপগঞ্জ উপজেলা কমিটির সভাপতি। একই সঙ্গে তিনি একজন পরিচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় বক্তা। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি ২ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট পান। এতে বোঝা যায়, আসনটিতে তার একটি ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক রয়েছে। চলমান নির্বাচনে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন।
আড়াইহাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী মো. হাবিবুল্লাহ একজন শিক্ষক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় পর্যায়ে তার সংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ছিলেন তৃতীয় স্থানে। ফলে নির্বাচনী এলাকায় তার একটি পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী গোলাম মসীহ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি দীর্ঘ সময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা।
গোলাম মসীহ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত প্রায় ১৫ বছর এই আসনে জাতীয় পার্টির এমপি থাকায় এলাকাটিতে তার ব্যাপক পরিচিতি ও সমর্থক রয়েছে। ফলে দলীয় ভোটের বাইরে তার ব্যক্তিগত ভোটব্যাংকও একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফতুল্লা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি ইসমাইল কাউসার, যিনি ইসমাইল সিরাজী আল মাদানী নামেও পরিচিত। তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মাহ পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
পেশাগতভাবে তিনি হজ ও ওমরাহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান লর্ড ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস এবং এম এ এম ট্রাডিং ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান। নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গত বছর থেকেই তিনি ফতুল্লা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে আসছেন। যা ইতোমধ্যে তাকে ওই অঞ্চলে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মাছুম বিল্লাহ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মহানগর শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে এলাকাটিতে তার শক্তিশালী সংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে।
সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মাছুম বিল্লাহ একজন ইসলামী বক্তা ও মুফতি হিসেবে ধর্মীয় সভা-সেমিনারে নিয়মিত অংশ নেন, যা তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। তিনি ২০২২ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় ভোটের পাশাপাশি তার একটি স্বতন্ত্র ভোটব্যাংক রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবারও পরিচিত ভোটব্যাংক ও প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভর করে মাঠে রয়েছে। যদিও দলটির সামগ্রিক ভোটের হার এখনো বিজয় নির্ধারণের পর্যায়ে নয়, তবে কয়েকটি আসনে প্রভাবক শক্তি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফলাফলের হিসাব পাল্টে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। জোটের বাইরে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত দলটির জন্য কতটা লাভজনক হয়, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিনই। যেখানে ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক এবং ভোটারদের মনোভাবই হয়ে উঠবে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর।





































