৩০ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২১:৫২, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

ফতুল্লায় কোটিপতি প্রার্থীদের ভিড়ে ফ্যাক্টর টাকা নাকি অন্য কিছু

ফতুল্লায় কোটিপতি প্রার্থীদের ভিড়ে ফ্যাক্টর টাকা নাকি অন্য কিছু

শিল্পাঞ্চল ফতুল্লা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত আসনগুলোর একটি। একদিকে একাধিক কোটিপতি ও হেভিওয়েট প্রার্থীর উপস্থিতি, অন্যদিকে বিএনপির ভোট বিভাজন ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান- সব মিলিয়ে আসনটি নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, শেষ পর্যন্ত এখানে ফ্যাক্টর হবে কি টাকা, প্রতীক নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ ও সংগঠিত শক্তি?

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, এ আসনে অন্তত ছয়জন প্রার্থী কোটিপতি। আসনটিতে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ আলম। তার সম্পদের পরিমাণ ৬২ কোটিরও বেশি। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সম্পদ ১৭ কোটির বেশি। এছাড়া, বিএনপি জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর ঘোষিত সম্পদ ২ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি। রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলীর সম্পদ প্রায় ৬ কোটি টাকা।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. ছালাউদ্দিন খোকার সম্পদ প্রায় ৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনও কোটিপতি।

রাজধানীর পাশের শিল্পসমৃদ্ধ জেলা হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ বরাবরই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ফলে এই আসনে প্রভাবশালী ও অর্থবান প্রার্থীদের আধিক্য নতুন কিছু নয়। অর্থবিত্তের প্রভার এর আগেও ভোটের মাঠে স্পষ্ট ছিল। সম্পদশালী প্রার্থীরা বিগত নির্বাচনগুলোতে টাকার যথেচ্ছ ব্যবহারও করেছেন। তবে, এবার ভিন্নতা তৈরি করেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর মাঠে থাকা।

যদিও আসনটি আগেও ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতাদের দখলে। আসনটিতে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা একেএম শামীম ওসমান। এ আসন থেকেই সংসদে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী। তাদের আগে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতাও ছিলেন এ আসনের সংসদ সদস্য।

তফসিল ঘোষণার পর আসনটির বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। দু’জন প্রার্থী সরে দাঁড়ালেও বাকিরা মাঠে সক্রিয় আছেন পুরোদমে। বিএনপি জোটের প্রার্থী ‘খেজুর গাছ’ প্রতীকে রয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। তবে তার বিপরীতে মাঠে রয়েছেন বিএনপির সাবেক দুই সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি নেতা মো. শাহ আলম।

গিয়াস উদ্দিন ও শাহ আলম দু’জনই দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের বড় কর্মীবাহিনী থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়াতে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল কঠোরতা দেখালেও তারা মাঠ ছাড়েননি। বরং নিজ নিজ বলয়ের নেতাকর্মী ও ভোট-ব্যাংক নিয়ে সক্রিয় রয়েছেন। এতে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী বিএনপির ভোট একাধিক ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিএনপির একটি বড় অংশের ভোট ভাগ যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মোহাম্মদ আলীর প্রার্থিতার কারণেও। রাজনীতিতে ‘কিং মেকার’ খ্যাত মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি নামে নতুন একটি দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপির এ সাবেক সংসদ সদস্য জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে এখনো অনুসারী বলয় বজায় রেখেছেন।

এই ভোট বিভাজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য। গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন এ আসনে উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন। তিনি শুধু এনসিপির প্রার্থী নন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলের সমর্থনও পাচ্ছেন। আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে জামায়াত তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে তাকে সমর্থন দিয়েছে।

পেশায় আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল আমিন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে তিনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

আসনটিতে এসব সমীকরণ থাকলেও পিছিয়ে নেই বিএনপি জোটের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী। ভোটের মাঠে ইতোমধ্যে গড়ে তুলেছেন শক্ত অবস্থান। চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকার মাঠঘাট। সাথে পাচ্ছেন বিএনপির বড় একটি অংশের নেতা-কর্মীকেও। আসনটিতে বিএনপি তাকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে এমন একটি প্রচারও তিনি প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন। তার জন্য একাধিবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভোট চাওয়ায় শক্ত অবস্থানেই আছেন তিনি। 

তাছাড়া, মনির হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জ্যেষ্ঠ নেতা, হেফাজতে ইসলামের জেলা সভাপতি এবং ইসলামী ঘরানার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। ফলে, ইসলামি ভোটেরও একটি অংশ তার পক্ষে যাবে।

তবে নির্বাচনী মাঠ শুধু টাকা ও সংগঠনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রায় সব প্রার্থীই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কালো টাকা, পেশিশক্তি ও অপরাধী চক্র ব্যবহারের অভিযোগ তুলছেন। এবং প্রত্যেকেই বলছেন, ফতুল্লাবাসীকে মুক্তি দিবেন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের কবল থেকে। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে এ প্রশ্নও তৈরি হয়েছে- যদি সবাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হন, তবে আশ্রয় দিচ্ছে কারা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসনটিতে টাকা ও সাংগঠনিক দক্ষতার প্রভাব যেমন থাকছে, তেমনি নির্বাচনি ফল অনেকটাই নির্ভর করবে ভোট বিভাজনের ওপর। বিএনপির ভোট যদি একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে সংগঠিত জোটসমর্থন ও ধারাবাহিক মাঠকর্মসূচি থাকা প্রার্থী এগিয়ে যেতে পারেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রভাবও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে ফতুল্লার এই নির্বাচনী লড়াই কেবল কোটিপতি প্রার্থীদের শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে টাকা, সংগঠন, রাজনৈতিক বিভক্তি ও নতুন নেতৃত্ব- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত এ জটিলতার সমাধান দিবেন ভোটাররা দেবেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের রায়ের মধ্য দিয়ে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়