০৩ নভেম্বর ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:৫৯, ৩ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২১:০০, ৩ নভেম্বর ২০২৬

শ্রমিক অবরোধ সড়কে আগুন, গাড়ি ভাঙচুর: পুলিশের কাঁদানে গ্যাস-সাউন্ড গ্রেনেড

শ্রমিক অবরোধ সড়কে আগুন, গাড়ি ভাঙচুর: পুলিশের কাঁদানে গ্যাস-সাউন্ড গ্রেনেড

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আবারও সড়কে নেমেছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। মঙ্গলবার দুপুরের খাবারের বিরতির পর শুরু হওয়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দুই দফায় কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

মঙ্গলবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। তাঁরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসিয়ে এবং কাপড় ও বাঁশে আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।

বিকেল সোয়া চারটার দিকে জালকুড়ি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। সংঘর্ষের সময় সড়কে থাকা কয়েকটি গাড়ির জানালার কাঁচও ঢিল মেরে ভাঙা হয়।

এ ঘটনায় পরে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ চারজনকে আটক করে। তাদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (‘ক’ সার্কেল) শামীম হোসাইন।

এর আগে দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছিলেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান। তবে খাবারের বিরতির পর বিভিন্ন কারখানা থেকে বেরিয়ে শ্রমিকেরা সড়কে জড়ো হতে থাকেন। প্রথমে পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা উপেক্ষা করে তারা সড়কে অবস্থান নেন। কয়েকটি স্থানে বাঁশ, কাঠের টুকরা ও ঝুটের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশের চেকপোস্টের ব্যারিকেডও সড়কে ফেলে রাখা হয়।

শিল্প পুলিশের নারায়ণগঞ্জ-৪-এর পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। শ্রমিকেরাও সহিংস আন্দোলনে নামবেন না বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুপুরের পর কিছু উসকানিদাতা তাঁদের রাস্তায় নামান। তাঁরা প্রায় ১০ হাজার শ্রমিককে সড়কে জড়ো করেন। যারা ইন্ধন দিয়েছেন, তাঁদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিকেল চারটার দিকে শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলনরত মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং মিলস লিমিটেডের শ্রমিক রেজাউল করিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, আগের দিনের আন্দোলনেও তিনি ছিলেন।

মঙ্গলবার সকালে কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তবে দুপুরের খাবারের বিরতির পর পাশের আরেকটি কারখানার শ্রমিকদের আহ্বানে আন্দোলনে যোগ দেন। এ সময় মালিকপক্ষ তাঁদের বাধা দেয়নি।

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে রেজাউল বলেন, “মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে, আলোচনা চলছে শুনছি। কিন্তু এ আলোচনায় তো আমাদের লাভ হইবো না। সরকার ১৫-১৬ হাজার টাকা বেতন করবো সর্বোচ্চ। কিন্তু বাজারের যে অবস্থা, তাতে এ বেতনেও কিছু হইবো না। আমরা ৩০ হাজার টাকাই বেতন চাই। নাহলে সবকিছুর, মানে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমিয়ে দিক।”

আবির ফ্যাশনের শ্রমিক তাছলিমা বলেন, “আমরা ৩০ হাজার টাকাই চাই। সরকারি লোকজনের বেতন লাখ লাখ টাকা বাড়ে। আমাদের বেতন এতটুকু বাড়ালেই সমস্যা হবে কেন? আমাদের বাঁচার মতো মজুরি দিলে হবে না। বাঁচার মতো অনেক বাঁচছি। এখন আর দশটা মানুষের মতো বাঁচতে চাই।”

তিনি আরও বলেন, “সবাই আন্দোলনে নামছে ন্যায্য দাবিতে। আমরা দাবি পুরা মানা ছাড়া সরবো না। আর দশজনের যেই গতি, আমারও সেই গতি হইবো।”

ওসমান গ্রুপের নিটিং কারখানার শ্রমিক আলেয়া বলেন, “প্রত্যেক মাসে বেতন যা পাই, তাতে বাসাভাড়া দিয়ে আর ঠিকমতো বাজারও করতে পারি না। প্রতিমাসে ধারদেনা কইরা চলতে হয়। মালিক-পুলিশ সবাই কয়, আমাগো দিয়াই নাকি দেশ চলে। কিন্তু আমি কই, আমাগোরে মাইরা দেশ চলে। আজকেও গার্মেন্টস থেকে বের হইতে দিতে চায় নাই। জোর কইরা সবাই বের হইছি। ৩০ হাজার টাকা বেতন আমাগো দিতে হইবোই।”

ওই কারখানার নিটিং ম্যানেজার শামীম হোসেনও শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বেতন বাড়ানো উচিত। এ কারণে তাঁরাও শ্রমিকদের বাধা দিচ্ছেন না। পাশের কারখানা থেকে শ্রমিকেরা বের হয়ে গেলে তাঁদের আর আটকে রাখা সম্ভব হয় না।

পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে প্রায় দেড় ঘণ্টা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার দিকে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে, দুপুরে স্থানীয় শিল্পকারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার জন্য নানা ধরনের চক্রান্ত শুরু হয়েছে। শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন করা। সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এরপরও কিছু কুচক্রী মহল শ্রমিকদের সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ তাঁদের কাছে এসেছে বলেও জানান তিনি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়