২৫ আগস্ট ২০২৬

শাহরিয়া প্রধান (ইমন)

প্রকাশিত: ১৮:১৪, ২৪ আগস্ট ২০২৬

দুই মাসে চার হত্যাকাণ্ড, বন্দরে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

দুই মাসে চার হত্যাকাণ্ড, বন্দরে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় গত দুই মাসে চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। গত ২৪ জুন থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পৃথক এসব ঘটনায় প্রাণ গেছে চারজনের। এসব ঘটনায় দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী শেখ সিফাতসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সর্বশেষ বুলবুল হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে। এর আগে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বৃদ্ধ আব্দুল মোতালিবকে মারধর করে হত্যা, নিখোঁজের ছয় দিন পর অটোরিকশাচালক মাছুম রানার মরদেহ উদ্ধার এবং পূর্ববিরোধের জেরে আমির হোসেন ডালিমকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে।

গত ২৬ জুন বন্দরের মুছাপুর ইউনিয়নের কুলচর এলাকায় পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হন আব্দুল মোতালিব (৬৪)। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বন্দর থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলার প্রধান আসামি মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হলেও নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এজাহারভুক্ত ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন মেম্বার ও তার ভাগিনা মোহাম্মদ আলী এখনো গ্রেপ্তার হননি। মামলাটি পুলিশ, ডিবি ও আরও একটি সংস্থা তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এরপর ৪ জুলাই বন্দরের তালতলা এলাকার একটি ডোবা থেকে মাছুম রানা (৩৫) নামে এক অটোরিকশাচালকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ছয় দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় রাসেল ও জুম্মন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট রাতে বন্দরের শুভকরদী এলাকায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন আমির হোসেন ডালিম (৩৬)। পরদিন ৬ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পূর্ববিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। নিহতের পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত হাবিব দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত। ঘটনার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হাবিবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সবশেষে গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদুল ইসলাম বুলবুলকে। এ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটিতে কিশোর গ্যাং, পূর্ববিরোধ এবং অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শেখ সিফাতসহ তার বাহিনীর আরও ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।

মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দাবি, শুধু হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার নয়; মাদক, কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সাম্প্রতিক সভায় বুলবুল হত্যাকাণ্ডসহ উপজেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি ও ইভটিজিং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, নারায়ণগঞ্জ অত্যন্ত জনবহুল এলাকা। বন্দরও একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দুঃখজনক হলেও দুই মাসে চারটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন অবনতি হয়েছে বলে পুলিশ মনে করছে না।

তিনি বলেন, “আমরা তারপরও কাজ করে যাচ্ছি, যেন এই সংখ্যাটা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা যায়।”

বন্দরের আলোচিত শেখ সিফাত প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, বন্দরে শেখ সিফাত বাহিনী ব্যাপক অপরাধ কর্মকাণ্ড করে আসছিল। সিফাত গ্রেপ্তার হওয়ায় বন্দরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তারা।

বারবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ থাকার পরও তাকে আগে গ্রেপ্তার করা যায়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা সবসময় তার পেছনে লেগে ছিলাম। সে প্রতিটি অপরাধের পরই এলাকায় থেকে গা-ঢাকা দিয়ে চলে যেত। তবে সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বন্দরের অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়