আলোচনা, গান ও আবৃত্তিতে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপন
আলোচনা, গান ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করেছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেল ৫টায় নগরীর আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগারের পঞ্চম তলার পরীক্ষণ হলে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে’। পরে শিশুদের অংশগ্রহণে ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গান, নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’সহ রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের বিভিন্ন গান ও কবিতা পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক দীনা তাজরিন। সমাপনী বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি মনি সুপান্থ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ২০২৬ সাল নারায়ণগঞ্জের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই বছরের ২ জুলাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জে এসে তাঁর আলোচিত কবিতা ‘অভিযান’ রচনা করেন। এ বছর ঐতিহাসিক এ দুটি ঘটনার শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে।
সাংস্কৃতিক জোটের প্রধান উপদেষ্টা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গোয়ালন্দ হয়ে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের প্রায় দুই শতাধিক ছাত্র-শিক্ষক তাঁকে বিদ্যালয়ে নিয়ে সংবর্ধনা দেন। ওই অনুষ্ঠানে নবম শ্রেণির ছাত্র কামাখ্যাচরণ মানপত্র পাঠ করেন এবং রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। সে সময়ের বিভিন্ন সংবাদপত্র, বিশেষ করে অমৃতবাজার পত্রিকায় ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আবুল কাসেমের উদ্যোগে প্রকাশিতব্য মাসিক পত্রিকা ‘অভিযান’-এর নামকরণ ও আশীর্বাণী দিতে একই বছর নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘অভিযান’ ওই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই রচিত হয়েছিল। পরে পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম সংখ্যা নারায়ণগঞ্জেই মুদ্রিত হয়।
রফিউর রাব্বি বলেন, নজরুল নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বসে ‘অভিযান’ কবিতা লিখেছিলেন—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ১৯২৬ সালে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে রচিত ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটির বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত গাইতে গাইতেই নজরুল একজন শিল্পী হিসেবে গড়ে উঠলেও নিজস্ব প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে বাংলা গানে স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়েই তাঁদের সময়ে নানা ধরনের বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা মূলত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে সীমাবদ্ধ থাকলেও নজরুলকে ধর্মীয় গোষ্ঠী, রাষ্ট্র ও সমসাময়িক সাহিত্যিকদের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাদণ্ড দেয়। ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন।
রফিউর রাব্বি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক নিয়ে সমাজে প্রচলিত অনেক ধারণার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতায় তাঁদের বিচার করার কারণে আমরা তাঁদের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে যতদিন নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায় থাকবে, ততদিন নজরুল প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মানবতাবাদী চেতনা নতুন প্রজন্মকে সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবমুক্তির সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করবে।





































