২৬ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:০৮, ২৬ আগস্ট ২০২৬

হেফাজতের নতুন কমিটিতেও কাটেনি বিভক্তি

হেফাজতের নতুন কমিটিতেও কাটেনি বিভক্তি

রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের কার্যক্রম গত কয়েক বছরে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যকার বিরোধ ও বিভক্তিকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিনের সেই বিরোধের মধ্যেই প্রায় দুই বছর পর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নতুন নেতৃত্ব এলেও সংগঠনের ভেতরের বিভক্তি পুরোপুরি কাটেনি। নতুন কমিটি ঘোষণার অনুষ্ঠানেও বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে নগরের ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদে এক সভা শেষে জেলা ও মহানগরের আংশিক কমিটি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ।

ঘোষিত জেলা কমিটিতে ডিআইটি রেলওয়ে কলোনী জামে মসজিদের খতিব ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে সভাপতি করা হয়েছে। এর আগে তিনি জেলা হেফাজতের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

আমলাপাড়া মাদরাসার মাওলানা আব্দুল কাদেরকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং মাদানীনগর মাদরাসার মুফতি বশিরউল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বদিউল আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন খান (সোনারগাঁ), অর্থ সম্পাদক মাওলানা খোরশেদ আলম কাসেমী এবং প্রচার সম্পাদক মুফতি শেখ শিব্বিরের নাম ঘোষণা করা হয়।

মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মুফতি জাকির হোসেন কাসেমীকে। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন দেওভোগ মাদরাসার মাওলানা আব্দুর রহমান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি মামুনুর রশীদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন মাওলানা মাহমুদ ইবনে আউয়াল।

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ জানান, পরবর্তীতে আরও সদস্য যুক্ত করে জেলা ও মহানগর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে।

আগের কমিটি নিয়ে বিরোধ

এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর চাষাঢ়ার বাগে জান্নাত জামে মসজিদে প্রতিনিধি সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতের কমিটি ঘোষণা করেছিলেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব।

তবে ওই সম্মেলনে মাওলানা আব্দুল আউয়ালসহ নারায়ণগঞ্জের হেফাজতের বড় একটি অংশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন না।

ওই কমিটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে জেলা সভাপতি এবং খেলাফত মজলিসের নেতা এবিএম সিরাজুল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। মহানগর কমিটিতে মুফতি হারুনুর রশিদকে সভাপতি এবং মাওলানা মীর আহমাদুল্লাহকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়।

কমিটি ঘোষণার পরই এ নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া এবিএম সিরাজুল মামুন দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং ঘোষিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন।

তখন এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে জেলা কমিটির মূল দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়া এবং জেলা ও মহানগরের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের মতামত উপেক্ষা করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

পরে মাওলানা মামুনুল হকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল নারায়ণগঞ্জে ডিআইটি মসজিদে আসেন। তারা উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সম্মেলনে ঘোষিত কমিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানান।

ফেরদাউসুর রহমানকে ঘিরে বিরোধ

ওই কমিটি ঘোষণা ও প্রতিনিধি সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। তিনি এর আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল—হেফাজতের একটি অংশের এমন অভিযোগের পর তাকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে বিরোধ আরও তীব্র হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হেফাজতের ভেতরের এই বিরোধ আরও প্রকাশ্যে আসে। সংগঠনের একাংশ ফেরদাউসুর রহমানকে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরোধিতা করে আসছে।

এর মধ্যেই গত ৩০ সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও মহানগর হেফাজতের সাবেক প্রচার সম্পাদক জাহিদ হাসান হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানসহ হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে দায়ী করেছিলেন।

দুই পক্ষের অনুপস্থিতি

হেফাজতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টি ২০২৪ সালের প্রতিনিধি সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই সেখানে উপস্থিত থাকলেও নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সংগঠনটির দুই নায়েবে আমীরের কেউই ওই সম্মেলনে ছিলেন না।

আজ বুধবার নতুন কমিটি ঘোষণার অনুষ্ঠানেও আগের কমিটি ঘিরে থাকা বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

ফলে নতুন কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো নতুন করে সাজানো হলেও নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের দীর্ঘদিনের বিভক্তি কতটা দূর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়