প্রিমিয়ার ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারিতেও ছিল নজরুলের দুই প্রতিষ্ঠানের নাম
বিদেশে পণ্য না পাঠিয়ে কেবল ভুয়া রপ্তানি দেখানোই নয় প্রিমিয়ার ব্যাংকের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনাতেও নাম এসেছিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের দু’টি প্রতিষ্ঠানের নাম। দুই বছর আগে ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে সীমার বিপরীতে তিনগুণ বেশি টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছিল। এমনকি রপ্তানির বিপরীতে আমদানি কম থাকার কথা থাকলেও নজরুলের দুই প্রতিষ্ঠানের নামে তার তিনগুণ আমদানি দেখানো হয়েছিল।
নজরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান দু’টি হলো- আমানা নিট ফ্যাশন ও আরটি ফ্যাশন। এ দু’টি প্রতিষ্ঠানকে পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপী বলেও চিহ্নিত করে।
প্রেস নারায়গঞ্জের হাতে আসা গত বছরের একটি ঋণখেলাপীর নথি বলছে, নজরুল ইসলামের মালিকানাধীন আমানা নিট ফ্যাশনের ঋণ খেলাপী অর্থের পরিমাণ ৮৪ কোটি ৭৫ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৮ টাকা এবং অপর পোশাক কারখানা আরটি ফ্যাশনের ঋণ খেলাপী অর্থের পরিমাণ ৩৬ কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার ৪৮০ টাকা।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি তদন্তের বরাতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় এক প্রতিবেদেন বলা হয়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে আমানা নিট ফ্যাশন ও আরটি ফ্যাশনের নামে নির্দিষ্ট সীমার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেবল ঋণই নয়, রপ্তানির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাচামাল আমদানি করেছিল এ দু’টি প্রতিষ্ঠান। পরে এসব ঋণ ও রপ্তানি-আমদানির সমন্বয় করা হয়েছিল চলতি হিসাবের থেকে ডলার কেনার মধ্য দিয়ে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও রপ্তানি-আমদানি চুক্তির পরিপন্থী।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আমানা নিট ফ্যাশন ও আরটি ফ্যাশনের ২৮ কোটি টাকা সীমার বিপরীতে ৮৬ কোটি টাকা দিয়েছিল ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি ৯৫ লাখ ডলারের রপ্তানির জন্য ৩ কোটি ৫ লাখ ডলারের আমদানি দেখিয়েছে। কিন্তু তার ৯০ শতাংশই ছিল স্থানীয়।
ওই সময় প্রিমিয়ার ব্যাংকের ওই শাখায় সরেজমিনে তদন্ত করে বিএফআইইউ। পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে কোন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির জন্য আমদানির পরিমাণ কোনোভাবে ৯০ শতাংশের বেশি হবে না। ওই সময় এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে পরিদর্শক দল।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস বিভাগের এক তদন্তে প্রমাণিতও হয়েছে যে, এসব পণ্য মূলত রপ্তানি করাই হয় না। অর্থ আত্মসাতের উপায় হিসেবে জাল কাগজপত্র তৈরি করে পণ্য রপ্তানি দেখানো হয়।
আমানা নিট ফ্যাশন ও আরটি ফ্যাশন ছাড়াও ফতুল্লার মাসদাইর এলাকায় নজরুল ইসলামের আরও কয়েকটি পোশাক কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন এবং আরটি ফ্যাশনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি পণ্য বিদেশে রপ্তানি না করেই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের এক তদন্তের বরাতে দেশের শীর্ষ দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধায় কাঁচামাল এনে পণ্য উৎপাদনের পর তা বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়ে এসব পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করতেই এ ধরনের অসাধু উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। নজরুল ইসলামের তিন প্রতিষ্ঠানসহ মোট সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই উপায়ে অন্তত ২৪ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানির তথ্য পেয়েছে কাস্টমস। এই রপ্তানিকে ভুয়া বা ভূতুড়ে বলে চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, আমদানির সময় পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে কিছু রপ্তানিকারক বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছেন। পরে সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধ দেখাতেও ভুয়া রপ্তানির কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
দু’টি ঘটনাই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তবে, এ বিষয়ে নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনের নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে, তার ছেলে নাবিল আহমেদ সাকিব মুঠোফোনে বলেন, “প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিষয়টি আমরা সংবাদ সম্মেলন করেই জানিয়েছি। এখানে ব্যাংক নিজেই আমাদের নামে আইডি তৈরি করে জালিয়াতি করেছে। আমরা এ বিষয়ে মামলাও করেছিলাম। এবং আমাদের পক্ষে হাইকোর্টের রায়ও রয়েছে।”
অন্যদিকে, পণ্য রপ্তানি না করেও কাগজে রপ্তানি দেখানোর বিষয়টিকে অস্বীকার করে উল্টো কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদন্তের উপর প্রশ্ন তোলেন সাকিব। “হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে আমাদের পণ্য পাঠাতে কিছুটা জটিলতা রহয়েছিল। কিন্তু এখানে কোনো জালিয়াতি হয়নি। আমরা নিয়মিত শিপমেন্ট করছি। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এইখানে জটিলতা তৈরি করেছে। সকল তদন্ত রিপোর্ট আমাদের ফেভারে রয়েছে,” দাবি করেন তিনি।





































